ব্যবসা ও চাকরির চেষ্টা
পড়ালেখা শেষ করে চাকুরির চেষ্টা করলাম। ভালো ফলাফল করেও অনেক জায়গায় চাকরি হয় না। অথচ খারাপ রেজাল্টের অনেকেরই চাকরি হয়ে যায়। এর কারণ কী? কিছু দিন পর বুঝলাম- এটা অন্য কিছু নয়, মাম, খালু, দুলাভাই, চাচা বা অন্য কারো জোর বা তদবির। এসব যার নেই তার চাকরিও নেই। চেষ্ট করতে করতে বয়স শেষ হয়ে গেল। তারপর মনে করলাম ব্যবসায় যাই। কিছু টাকা-পয়সা নিয়ে নামলাম ঠিকাদারি ব্যবসা করব। অফিসে ঘুওে যা হাল-হকিকত দেখলাম, অধিকাংশ ক্ষেত্রে সততার কোন বালাই নেই। গাড়ি নষ্ট না হওয়া সত্ত্বেও পার্টস কেনার বিল চাকা কেনার বিল, কোন বিল্ডিং বা অন্য কিছু রিপিয়ারিং করার কোন খবর নেই, অথচ এস্টিমেট ও বিল পাস হয়ে চেক নিয়ে ভাগাভাগি শেষ। ব্যাপারটি তখনই আমার গোচরীভূত হলো যখন আমি কোন একটি ডিপার্টমেন্টে এস্টিমেট দিলাম। অনুমোদনকারী অফিসারের টেবিলে মাসের পর মাস পরে রইল। ফাইল পাস হওয়ার কোন খবর নেই। পুরোনো কন্ট্রাক্টররা দিব্বি কাজ করে যাচ্ছে। অনেক পরে দাখিল করা এস্টিমেটও পাস হয়ে যাচ্ছে, আমারটার কোন খবর নেই। তাহলে আমি কি ঠিকাদারি করার যোগ্যতা রাখি না? অফিসে আসা-যাওয়ার একজন পুরান ঠিকাদারের সাথে বেশ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। তাকে বললাম, ভাই আপনারা দিব্বি কাজ করছেন, কিন্তু তিন-চার মাস মাসে আমার একটা এস্টিমেটও পাস হলো না। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, কত টাকার এস্টিমেট। বললাম, পচাঁত্তর হাজার টাকা। বললেন ছেড়েছেন ঠিকঠাক মত। ছাড়ার ব্যাপারটা কিছু কিছু তখন বুঝি। বললাম, কত ছাড়ব, পঞ্চাশ তো বাঁধাই আছে। বলেন কী? লাভ হবে না পাঁচ হাজার আর ছাড়ব পঞ্চাশ, জোক করেন নাকি! তিনি হেসে বললেন, আরে মিয়া নতুন এসেছেন তো আস্তে া আস্তে সব বুঝবেন। আমি বললাম, তাহলেও এত কী করে সম্ভব।তিন বললেন , সম্ভব নয়? কি কওে দেবেন? শুধুৃ একটা কাগজের বিলে চেক নেবেন পচাঁত্তর হাজার টাকার , পঞ্চাশ হাজার গেলেও তো আরও থাকবে পঁচিশ হাজার। টাকা না দিয়ে টাকার ব্যবসা তাও যদি না পারেন তবে জী করে খাবেন? কেন মাল দিতে হবে না? আরে সাহেব প্রতি দিন যত এস্টিমেট্ পাস হয় সব মাল দিলে এ গোডাউন ভরেও দেশের সব গোডাউন ভরে যেত। বললাম, সবাই কি এই কাজ করে? তিনি বললেন, টুকটাক কিছু কাজ হয়, যা না হলেই নয়। সাথে এটাও বললেন, ইঞ্জিনিয়ার আর অফিসার সাহেবদের এত বাড়ি-গাড়ি কোথেকে হয়? সন্ধ্যার পর মদেও বারগুলোতে বসার জায়গা পাওয়া যায় না। সব অফিসার সাহেবরা। এরা কত টাকা বেতন পায়? যে শুধু টাকার ছড়াছড়ি, মদ, নারী, বেশভুষা আর অজস্র শখ। পরের দিন ঐ ভদ্রলোক ঠিকাদার ভাইকে ওস্তাদ ডাকলাম। বললাম, ওস্তাদ আমাকে একটু ব্যবসা শেখান না। মাসখানেক ধরে তিনি আমাকে ঠিকাদারি আর সাপ্লাই যেভাবে শেখালেন তা হলো ইঞ্জিনিয়ার আর অফিসারদের সাথে প্রথমে বন্ধুর সম্পর্ক করতে হবে। মদ, মেয়ে-মানুষ দামি সিগারেট ্এগুলো অফার করতে হবে।
যেখানে শুধু এস্টিমেট পাস করিয়ে ভাগাভাগি না হয় সেখানেন কনস্টাকশন কাজ হবে, রড সিমেন্ট দিবেন, এস্টিমেটের অর্ধেকের টাকা ভাগাভাগি করবেন। ঘন ঘন কাজ না করলে বেশি বেশি লাভ করবেন কিভাবে। যদি সাপ্লাই দেন তবে যে রেটে টেন্ডার দিবেন তার চেয়ে কম দামের মাল দিবেন। প্রযোজন হলে নির্ধারিত সংখ্যার অনেক কম মাল দিবেন, সব কিছুই হবে কন্ট্রাক্টে। আপনার কাজই হল কন্ট্রাক্ট করা। যত ভালো করতে পারবেন ততই লাভ, বুঝলেন তো? নব্য ঠিকাদার এখন থেকে এভাবেই তৈরি হোন, সাধু সেজে কোন কিছু হবে না, চালু হন। ওস্তাদের একদিনের এ কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শোনার পর বললাম, সব অফিসার আর ইঞ্জিনিয়ারই কি এরকম লাইনের লোক? তিনি বললেন, সব ভুল হবে, তবে কোন সৎ অফিসার এসে উৎপাত করলে সংগ্রাম শুরু করতে হয়। প্রয়োজনে চাঁদা ধরে তার বদলী। তাছাড়া কোন উপায় নেই। এসব হয়ে যায়, থাকলে আস্তে আস্তে সব শিখে ফেলবেন। একসময় আমার মত আপনিও
ওস্তাদ হয়ে যাবেন। আমি যখন প্রথম ব্যবসায় আসি তখন মাত্র ত্রিশ হাজার টাকা ক্যাশ ছিল। আর এখন তিন-চার কোটি টাকা বছরে চাঁদাই দেই। কিসের চাঁদা দেন? কেন পার্টির দরকার হয়। সে আবার কেমন ওস্তাদ! ধরুন এক জায়গায় টেন্ডার দিতে গেলাম সেখানে দুরমুজ পার্টিও জোর বেশি তখন তাদের টাকা দিয়ে কন্ট্রাক্ট করলাম। যে টাকা দিলাম তা রেটের মধ্যে বেশি করে ধরলাম। ওরা স্টেনগান নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো, আমি টেন্ডার ড্রপ করলাম। অন্য কেউ ড্রপড করতে পারল না। আমি ব্যবসা পেয়ে গেলাম, টাকা বেশি খরচ হলো সরকারের। আমার কি অসুবিধা, ওরাও কিছু পেল, সবই তো ভাগযোগ আর কন্ট্রাক্ট তা ছাড়া দুরমুজ পার্টির জোর যেখানে বেশি সেখানে কাজ করতে হলে তাদের তো হাতে রাখইে হবে। বিশাববিদ্যালয়ে কাজ করতে গেলে যে হলে কাজ করবেন, যেখানে যে সংগঠনের জোর বেশি তাদের সাথে সমঝোতা না করলে কাজ করতে পারবেন না। কর্পোরেশনগুলোতে যে শ্রমিক সংগঠনের জোর বেশি তাদেও সাথেওঅনুরুপভাবে সমঝোতার প্রয়োজন। না হওে মারধর খাওয়া আর বিপদের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যায়না। আর সম্পদ ভালো থাকলে কোন অসুবিধা নেই। সর্বত্রই অন্তত তা করতেই হবে। তার পর বড় সাহেবদের কি প্রয়োজন, তা তো জানেনই। এমন অনেক জায়গা আছে যেখানে এসবে কাজ হয় না, সেখানে অন্যান্য ঠিকাদারদের টাকা দিয়ে রেট বেশি দিয়ে নেগোসিয়েশন করে নিতে হয়। ওস্তাদেও কাজ থেকে রংবাজ পালা, সব পার্টি, আর বড় সাহেবদের মনোরঞ্জন করার কিচ্ছা-কাহিনী শুনে একদিন জিজ্ঞাসা করলাম, এদের ধরার কেউ নেই? তিনি বললে, আকছে। থাকলেও তারা কি ফেরেশতা? ভাগহ তারাও পায়। রাস্তা সবই পরিষ্কার, কোন অসুবিধা নেই। সব সমস্যার সমাধানের জিনিস একটাই, আর সেটা হলো টাকা। আর এই ঔষধের গুণে রক্ষকও ভক্ষক হয়ে যায়। আর যেখানে রক্ষক ভক্ষক হয় সেখানে না আছে কোন বিহীত ব্যবস্থা।
অতএব এটা নিয়ে চিন্তা কওে কোন লাভ নেনই, এভঅবেই চলুক যতদিন চলে। ওস্তাদেও থেকে এসব শিখার পর যখন কন্ট্রাকক্টর হতে পারলাম না তখন আমদানি-রপ্তানি আর ইনডেনটিং ব্যবসা করতে বাণিজ্যিক এলাকায় অফিস নিয়ে বসলাম। যার অনেক দিন ধরে এ ব্যবসার সাথে জড়িত মার্কেট একচেটিয়া তাদের দখলে। আমদানিকারক পাওয়া বড় কঠিন হয়ে পড়ল। দেশে- বিদেশে পত্র যোগাযোগে অব্যাহত রাখলাম।
কোন ব্যবসা নেই। শুধু অফিস ভাড়া আর কর্মচারীর বেতন টেনেই যাচ্ছি। একদিন আমার এক কলেজ জীবনের বন্ধুকে ডাকলাম পরামর্শের জন্যে, যে নাকি অল্পদিনেই কয়েকটা কার্গোর মালিক হয়েছে। ঢাকায় চারতলা বাড়ি করেছে। বন্ধুকে ব্যবসা না পাওয়ার সব বৃত্তান্ত জানানোর পর সে আমাকে যা পরামর্শ দিল, তা হলো অফিসে দামি ডেকোরেশন করতে হবে, বিদেশি কার্পেট বিছাতে হবে, এয়ারকুলার লাগাতে হবে। একজন সুন্দরী রিসিপশনিস্ট রাখতে হবে। ব্যবসায়িক প্রয়োজনে দেশি-বিদেশি পার্টিদের মাঝে অফিসে তিন-চারটা টেলিফোন থাকতে হবে। অর্থাৎ তোমার এবং অফিসের পরিবেশ দেখে পার্টিরা যেন বোঝে যে, তোমরা রুচিবোধ আছে এবং তুমি একজন ভালো এবং টাকাওয়ালা ব্যবসায়ী। এছাড়াও বন্ধুটি আমার আরও কিছু বুদ্ধি পরামর্শ দিলেন, যা কিনা ভদ্রসমাজে বলা যায় না। তবে মারাত্মক যে বুদ্ধিটি আমি পেলাম, তা হলো মোটা অংকের এলসি খুলে মালপত্র আনার কোনো দরকার নেই। বৈদেশিক মুদ্রা বাইরে পাঠাতে পারলেই হলো। এতেও মোটা অংকের কমিশন পাওয়া যাবে যা-হোক বুদ্ধি-পরামর্শ পেলাম। এর মধ্যে এক বন্ধু এসে যুক্তি দিল রাতারাতি ধনী হওয়ার এমন ব্যবসা একখান আছে, জেনে খুশিতে লাফ দিয়ে উঠলাম। এটাইতো আমার চাই। বললাম, দোস্ত কি সেই যাদুমন্ত্রের ব্যবসা? সিনেমা তৈরি করা। আরও ভাল কথা। তার কথায় মনস্থ করলাম ফিল্ম তৈরি। হাত দিলাম কাজে।