একজন সরকারি কর্মকর্তা

0 2,948

অনেক দিন পর এক বন্ধুর সাথে দেখা। গাড়ি থামিয়ে আমাকে ডেকে গাড়িতে তুলে নিল। ভাববিনিময়ের পর জানতে পারলাম সে একজন বড় সরকারি কর্মকর্তা। আলাপ-আলোচনার এক পর্যায়ে জিজ্ঞাসা করলাম, দোস্ত বেতন পাও কত? পনের হাজার টাকা। কথা বলতে বলতে একবাওে বাসায় নিয়ে গেল। পরিচয় করিয়ে দিল তার স্ত্রী আর দুইজন ছেলে-মেয়ের সাথে। বাসায় টিভি, ফ্রিজ, ভিসিয়ার, সোফা, আধুনিক কোন সরঞ্জামের অভাব নেই। অর্থাৎ ওয়েল ডেকোরেটেড। ছেলে-মেয়েরা বিদেশী স্কুলে পড়ে, দু’জনের বেতন বিশ হাজার টাকা। বাসা ভাড়া বিশ হাজার টাকা বাজার ও অন্যান্য খরচ আরও বিশ হাজার টাকা। তাছাড়া বন্ধুটির পুরোনো অভ্যাস সন্ধ্যার পর একটু-াাধটু পান করা। তার জন্য আরও বিশ হাজার টাকা। স্ত্রী-পুত্রের কাপড়-চোপড় বাবদ আরও দশ হাজার টাকা মাসে ব্যয় হয়। গ্রামের বাড়িতে বাবা-মা-ভাই-বোন এদের জন্য তিন হাজার টাকা মাসে পাঠাতে হয়। অর্থাৎ আমার বন্ধু যে হিসাব দিল তাতে তার মাসে খরচ হয় দুই লক্ষাধিক টাকা। কোথেকে আসে সেটা আর জিজ্ঞাসা করলাম না। তবে এর জন্য অবশ্যই তাকে অন্য কোন পথ অবলম্বন করতে হয়। হয়ত ব্যবসা, না হয় অন্য কিছু। মনের কৌতুহল নিবৃত্ত না হওয়ায় একদিন তার অফিসে গিয়ে হাজির হলাম। আলাপ প্রসঙ্গে বললাম, দোস্ত ; তা উপরি মাসে কত পাও? তিন লক্ষ টাকা মাসে পাই। তা না পেলে চলবেইবা কেমন করে। তা চাচা কি এসব জানে অর্থাৎ তার বাবা, যাকে আমি চাচা ডাকতাম। তিনি একজন ধার্মিম পরহেজগার লোক এবং গ্রামে সৎ ব্যক্তি বলেই পরিচিত। তাঁর জানার কথা জিজ্ঞেস করতেই বলল- ওরে বাবা, তোমার চাচা! তাই বলেই ফেললাম, তা দোস্ত চাচা এত ভালো মানুষ আর তুমি যে উপরি-টুপরি নাও, এগুলো না নিলে চলে না। তুই একটা আস্ত লঘস (চরম বোকা) ছাড়া কিছু না। আরে ব্যাটা ঢাকা শহরে থাকি, ঢাকার মেয়ে বিযে করে। তার বিদেশী কসমিটিক লাগে, বাচ্চাদের পড়াই ইংলিশ স্কুলে, তাদের বেতন লাগে। অফিসার হিসেবে আমার একটা স্ট্যাটাস আছে। সে রকম একটা বাসা লাগে। চলাফেরার একটা সোসাইটি আছে, এর জন্য কিছু খরচ করতেই হয়। বাসায় বাজার আর অন্যান্য খরচ তো বাদ দেয়া যায় না। এর কোনটা না হলে হয় বল? ১৫-২০ হাজার টাকা দিয়ে কি এগুলো সম্ভব? তাই একটু এদিক-ওদিক না করে পারা যায় না। আমার জায়গায় তুই হলে বুঝতি উপরি-টুপরি ছাড়া কিভাবে চলে। কথা চলছে, এরই মধ্যে বন্ধুটি চায়ের কথা বলল। আমি তো চা খাই না দোস্ত, তা আজ যাই, অন্য একদিন আসব। রাস্তায় বেরিয়ে চিন্তা করতে লাগলাম, এরকম তো আরও অনেক বন্ধুই বড় বড় সরকারি কর্মকর্তা। সবাই কি তাহলে এরকমই করছে। ওদের সবারই তো এগুলো প্রয়োজন, বাসা ভাড়া, সংসারের খরচ, বাচ্চাদের স্কুলের বেতন, নিজের পকেট খরচ, স্ত্রীর প্রসাধনী কোনটাই তো না হলে নয়। মহল্লার ভিতরে ঢুকেই ঝুপড়ি দোকানের সামনে দেখা। বন্ধুর গাড়ির ড্রাইভার টা পাইপ দিয়ে গাড়ি থেকে তেল বের করছে। দেকেও আমি না দেখার ভান করে চলে এলাম। বেচারা ড্রাইভার আবার লজ্জা পাবে। তাছাড়া সবাই যখন পাবলিকের মাল খাচ্ছে তখন বেচারা ড্রাইভার না হয় একটু সরকারি মাল খেলই, তাতে দোষেরইবা কি! এ ঝুপড়ি দোকানের সামনে লাল নাম্বার প্লেটের গাড়ি প্রতিদিনই আমার চোখে পড়ছে। মুহুর্তের মধ্যেই কয়েক গ্যালন নামিয়ে দিয়ে চলে যায়। একদিন এক সরকারি গাড়ির ড্রাইভারকে জিজ্ঞাসা করলাম,ভাই আপনার গাড়ি গ্যালনে কত চলে? গাড়িটি নতুন প্রাইভেট কার, ড্রাইভার জবাব দিলেন, ৮/১০ মাইল চলে। নতুন গাড়ি এত কম চলে!সাথে সাথে ড্রাইভার সাহেব জবাব দিলেন, স্যার সরকারি গাড়ি তেল একটু বেশি খায়। না হলে আমরা বাঁচব কেমন করে! সহজ কথায় আমাকেক বুঝিয়ে দিল, আমি আর কোন জবাব দিতে পারলাম না। অবশ্য একদিন এক বয়স্ক  ড্রাইভার আমাকে বলেছিল, স্যার যে বেতন পাই তাতে ৩/৪ টা ছেলে- মেয়ে নিয়ে ঢাকা শহরে খুব কষ্ট হয়। তাই বাধ্য হয়ে একটু এদিক-ওদিক করতে হয়। সব জীবন রক্ষার তাগিদে। তার এই মানবিক কথাগুলো আমি সহনুভূতির সাথে শুনেছিলাম বটে, কিন্তু বন্ধু আর বন্ধুর ড্রাইভার সবাই কি নিতান্তই প্রয়োজনের তাগিদে এ পথ বেছে নিয়েছে, নাকি নৈতিক চরিত্রে অবক্ষয়! যা-হোক এ বিষয়টা নিয়ে আমি আর মাথা ঘামাতে চাই না। নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ায়ে লাভ কী! বাসায় স্ত্রী অসুস্থ। তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। সে চিন্তা চেপে আছে মাথায়। পরের দিন সকালে স্ত্রীকে নিয়ে হাসপাতালে গেলাম।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.