মানবতার অভাব প্রকট

0 3,200

সোমালিয়া আর সুদানের দুর্ভিক্ষ পীড়িত ক্ষুধার্ত মানুষের কংকালচিত্র হেপবার্ণের মত অভিনেত্রীর ঘুম কেড়ে নিলেও ধনী বিশ্বের হৃদয় গলেছে যৎ-সামান্য। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইওে যাওয়ার আগে প্রতিরোধের ব্যবস্থা নিলে আজ প্লেন থেকে খাদ্য নিক্ষেপ করতে হত না। যেখানে এক কোটি ত্রি লক্ষ লোকের অনাহারে নিশ্চিত মৃত্যুর ঝুঁকি সেখানে বিশ্ব নীরব থাকতে পারত না। অথচ মানব সম্পদ রক্ষার স্বার্থেই বস্তু সম্পদ। মানব সম্পদ রক্ষার চাইতে বস্তু সম্পদ রক্ষাই যেন আজ প্রাধান্য পাচ্ছে বিশ্বে।
আজ আর হিংস্র জীবজন্তু মানুষের শত্র“ নয়, তারা মানুষের ভয়ে আশ্রয় নিয়েছে গভীর জঙ্গলে, তারাই মানুষের ভয়ে ভীত। কিন্তু সভ্য মানব সমাজ মানুষের ভয়েই ভীত, এটা মানবতারকাছে কত বড় লজ্জাজনক তা কি আমরা মানব সমাজ একবারও ভেবে দেখেছি,
ধর্মীয় বিদ্বেষের কারণে লড়াই করছে মানুষ। অথচ মানব সমাজ একবারও অনুধাবন করছে না যে, সব মানুষই একই স্রষ্টার সৃষ্টি জীব এবং অন্যান্য জীবের চেয়ে তার রয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য, ধর্ম, সংস্কৃতি, আচার-আচরণ ইত্যাদি। নৈতিক বিষয়গুলোতে রয়েছে মানুষের ব্যক্তি স্বাধীনতা। এ নিয়ে বিদ্বেষ সৃষ্টি করা মোটেও সমীচীন নয়। মানবিক সমস্যার চেয়েও গৌণ বিষয়গুলো কোনভাবেই বেশি গুরুত্ব পেতে পারে না। মূল সমস্যা ধনী দারিদ্রোল ব্যবধান, ধর্ম নিয়ে হানাহানি, সামাজিক অনাচার ইত্যাদি নিয়ে কাউকে উদ্বিগ্ন দেখা যাচ্ছে না।
তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলো থেকে উপনিবেশিকতার অবসান হলেও শোষকদের  গড়া আমলাতান্ত্রিকতার প্রভাব এখনও রয়ে গেছে সেখানে। এসব দেশের সরকার প্রধানরা ক্ষমতায় আসার আগে দৃঢ় অঙ্গীকার করে থাকে দারিদ্র দূরীকরণের, কিন্তু পরে দেখা যায় যারা আগে দু’বেলা খেত এখন এক বেলা খায়, যারা একবেলা খেত তারা অনাহারে থাকে। অপরদিকে দেশের ভাগ্য নিয়ন্তাদেও ব্যয় বাহুল্য আর বিলাসিতার কমতি পরিলক্ষিত হয় না একটুও । অভাবের তাড়নায় কোন দরিদ্র মানুষের সন্তান বিক্রির কথা, ভরণ-পোষণে ব্যর্থ হয়ে কোন পুরুষের স্ত্রী ত্যাগ, স্ত্রীর স্বামী ত্যাগ বা স্ত্রীর স্বামীর সংসার ছেড়ে যাওয়া, ক্ষুন্নি বৃত্তি না করতে পেরে স্ত্রী সন্তান নিয়ে স্বপরিবার আত্বহুতী দেয়া এ কথা আজ কল্পনাতিত নয়, দরিদ্র দেশের নৈমিত্তিক ব্যাপার।
ফসল না হলেও য়েমন কৃষকের খাজনা মাফ নেই, শ্রম না দিলে শ্রমিকেরও মজুরী নেই। অসহায় ভসমান মানুষ যদি নিরুপায় হয়ে আশ্রয়ের সন্ধানে কোন ধনী দেশে করুণা ভিক্ষা করতে যেয়ে হতাশ হয়ে কেউব তাড়া খেয়ে ফিরছে। কোথায়ও যেন তাদের ঠাঁই নেই। তারা যেন সত্যিই আবর্জনা। কোথায় মানবতা আর মানবাধিকারের  প্রবক্তারা, পেটের ক্ষুধায় আর প্রতারণার শিকার হয়ে কোন নারী যখন ইজ্জত বিক্রি করতে আসে পতিতালয়ে, তখন আমরা তাদের পতিতা বলে ঘৃণা করি, কিন্তু মাতৃকূলের অবমাননা আর অমর্যাদার কথা ভেবে একটু লজ্জিত হই না । সমাজে তাদের পুনর্বাসনের কোন উদ্যেগ নিতে আমরা আগ্রহী নই।
বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ দরিদ্র লোক আজ নানা সমস্যায় জর্জরিত, অস্বচ্ছলতা তাদের হতাশায় নিমজ্জিত করেছে। দারিদ্রকে তারা ভাগ্যের নির্মম পরিহাস বলে মনে করে অথচ তাদের মুখের আহার কেড়ে নিচ্ছে বিত্তশালীরা। বড় মাছগুলো যেমন ছোট  মাছ ধরে খায় তেমনি ধনীরা চুষে খায় দরিদ্র মানুষের রক্ত। একটি শিশু যখন জন্মগ্রহণ কওে তখন সে বুঝতে পারে না তার ধম, জাত, তার ভাষা-এমনকি সে নারী না পুরুষ। একজন মানুষের বড় পরিচয় হলো সে একজন “মানুষ” তাই তার সমস্যাবলী ব্যক্তিগত, জাতি গত বা ধর্মীয় সমস্যা হিসেবে চিহিৃত করাই উচিত। কিন্তু আজ বিশ্বের কোন দেশে জাতি বা সম্প্রদায়ের কোন সমস্যা হলে, তা ঐ জাতির বা রাষ্ট্রের সমস্যা হিসেসেই দেখা হচ্ছে। এর কারণ হলো মানুষে-মানুষে প্রেমপ্রীতি ও সহমর্মিতার অভাব, কে ককে ডিঙিয়ে উপরে উঠবে, কে কার উপর প্রভুত্ব করবে- এই প্রতিযোগিতাই আজ মানব সমাজে বিরাজমান। বিশ্ব মানবের সমস্যাবলী মোকাবেলায় সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কোন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। এ যেন যার ঘা তার  ব্যথা। মানুষে-মানুষে এই যে বৈষম্য, শোষক আর শোষিতের সম্পর্ক দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে, এ যেন মানব সভ্যতা ধ্বংসের পূর্বলক্ষণ তাতে কোন সন্দেহ নেই। শক্তিশালী দেশগুলো, অপেক্ষাকৃত দূর্বল দেশগুলোর উপর তাদের মতবাদ চাপিয়ে দিচ্ছে। ধনী দেশগুলোর সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টির উপর নির্ভর করে দরিদ্র দেশগুলোর সাহায্য-সহযোগিতা। শুধু যে দেশে দেশে, জাতিতে জাতিতেই এই শোষণমূলক অনাচার চলছে তা নয়, দরিদ্র দেশগুলোর ধ্বংসপ্রায় কৃষক সমাজের প্রতি আমলাতান্ত্রিক উপায়ে যে শোষণ ও জুলুম চলছে তাও ভয়াবহ।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.