বিশ্বের ব্যবসা-বাণিজ্য
এ পৃথিবীতে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের মধ্যে ব্যবসা হচ্ছে সবচেয়ে বড়। জীবনোপায়ের মাধ্যম, সভ্যতা ও সংস্কৃতির উপকরণগুলোর মধ্যে এটা হলো সবচেয়ে বড় উপকরণ। অভ্যন্তরীণ থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক পর্যায় পর্যন্ত চেয়ে দেখলে, দেখা যাবে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠি বা সম্প্রদায় এই ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করছে। হতে পারে তা ব্যক্তি, জাতি বা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে । একদিকে মূলধন এবং শ্রমের বৈষম্যের অস্ত্র দিয়ে এক জাতি অপর জাতিকে, এক সম্প্রদায় অপর সম্প্রদায়কে, এক দেশ অপর দেশকে শোষণ করছে। এভাবেই প্রভুত্ব আর দাসত্বের সৃষ্টি হচ্ছে এই সমাজে। সমাজতন্ত্রেই হোক, এক নায়কতন্ত্রই হোক, গণতান্ত্রিক রাজতন্ত্রই হোকা আর ফ্যাসিবাদ বা তার নব্য সংস্করণ গণতন্ত্রই হোক সব তন্ত্রেই শোষণের এই ধারা বিদ্যমান। একজন শ্রম দিয়ে তার জীবনোপায়ের সংস্থান করতে পারছে না, আরেকজন বিনাশ্রমে জীবনোপায়ের পরও অতিরিক্ত সম্পদ পুঁজিভূত করছে। এভাবে মানুষে মানুষে যে বিভেদ সৃষ্টি বা শ্রেণী গড়ে উঠেছে, তা কখনও শ্রেণী সংগ্রামের রুপ পরিগ্রহ করছে। জীবন ব্যবস্থার শ্রেনীগত স্বভাবজাত পার্থক্য থাকবে, কিন্তু জীবনোপায়ের অধিকারে অবশ্যই সুসমতা থাকতে হবে। সমাজে সবার একই ধরনের জীবনোপকরণ হবে এমন প্রত্যাশা করা বাঞ্ছনীয় নয়। তবে এ আকাক্সক্ষা পোষণ করা হয়তো অন্যায় হবে না যে, প্রয়োজন অনুযায়ী সবাইকে জীবনোপকরণ পেতে হবে। আর অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির পথ সবার জন্য সমভাবে অবারিত ও মুক্ত হতে হবে। আজ আমরা যা দেখতে পাচ্ছি তা হলো, বাণিজ্যের নামে জাতিতে জাতিতে, রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে, অর্থনৈতিক শোষণ ও হিংসা-বিদ্বেষ সৃষ্টি হচ্ছে। এর পরিণামে একের দাসত্ব অপরের প্রভুত্ব কিংবা একের সমৃদ্ধি অন্যের ধ্বংস নেমে আসছে। পুঁজিবাদী বিশ্ব বাণিজ্যিক শুল্ক ক্ষেত্রে এমন নীতি বা পদ্ধতি গ্রহণ করছে, যার মাধ্যমে অন্যেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
কোন দেশের জাতীয় সরকার তার দেশ ও জাতির বাণিজ্যিক অগ্রগতির জন্য মুদ্রা বিনিময় ও শুল্কহার নির্ধারণ করাটা নিজেদের অবশ্য কর্তব্য মনে করে থাকে। তারা এই মুদ্রা বা শুল্ক ব্যবস্থা এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করে, যাতে লোকসান না হয়ে লাভ হয় এবং ব্যর্থতার পরিবর্তে সফলতায় দেশ সমৃদ্ধ হয়। পুঁজিবাদী বিশ্ব বা গণতন্ত্রীরা এই নীতি-নির্ধারণের ফলে অন্য কোন দেশ বা জাতি যতই ক্ষতিগ্রস্ত হোক না কেন, তারা তার মোটেও তোয়াক্কা কওে না। বর্তমান বিশ্বের মুদ্রা ব্যবস্থার অগ্রগতির পরিমাণ অত্যন্ত ধ্বংসাত্বক প্রমাণিত হয়েছে। কেননা গণতন্ত্র নামধারী পুঁজিবাদীদের আবি®কৃত এই অস্ত্র দ্বারা শুধু পরাধীন জাতিগুলোর অর্থনৈতিক অবস্থারই ধ্বংস সাধন করা হচ্ছে না, বন্ধু রাষ্ট্রগুলোও একে অপরকে ধ্বংস করার জন্য বৈষম্যমূলক মুদ্রা বিনিময় হার ও কাগজে নোট নামের অস্ত্র দুটো ব্যবহার করছে।
বর্তমান বিশ্বে বৈষম্যের পাহার গড়ছে পুঁজিবাদী বিশ্বের সৃষ্টি করা এই গণতন্ত্র। ব্যবসা-বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক সফলতা ধ্বঙসের পেছনে মুদ্রা বিনিময়ের প্রভাব কারও অজ্ঞাত নয়। এই বিনিময় বৈষম্য উন্নয়নকামী দরিদ্র বিশ্বকে তাদেও কাঙিক্ষত অগ্রগতি সাধনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধনী বিশ্বের চাপিয়ে দেয়া ফর্মূলায় যে উন্নয়ন সম্ভব নয়, তা দরিদ্র বিশ্ব ভালোভাবেই বুঝতে পারছে। তাই তাদের সামনে এখন সময় এসেছে বিকল্প উন্নয়ন, বিকল্প অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, বিকল্প রাজনীতি ও সামাজিক ব্যবস্থা চিন্তা করার।
একজন মিশরীয় অর্থনীতি বিদ তার আলোচনায় বলেছেন, “অর্থনৈতিক ব্যাপারে দ’ুটি দলের অভিমত প্রসিদ্ধ। প্রথম দলটি হল অবাধ বাণিজ্যের পক্ষপাতি, তাদের দাবি হলো, বিদেশীদের রফতানি উপর কোনরুপ শুল্ক ধার্য করা উচিত নয়। ব্যবসাকে অবাধ রাখতে হবে তাই তাদের অধিকাংশের অর্থনীতি সেভাবেই নির্ধারণ করা হয়েছে। এই দলটি যেহেতু বিদেশী পণ্যের উপর কর ধার্যেও সমর্থক নয়,সেহেতু দেশীয় পণ্যের উপর কর ধার্যকরণকে তারা কোন অবস্থায়ই বৈধ মনে করে না। দ্বিতীয় দলটি ব্যবসা-বাণিজ্যের অগ্রাধিকার বা পক্ষপাতমূলক নীতির পক্ষপাতি।তাদের দাবি হলো কোন দেশে শিল্পজাত পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি পেলে তাদের শক্তি এবং তা প্রয়োগের ক্ষমতাও অনেক অগ্রগতি লাভ করে, প্রভাব প্রতিপত্তিও অনেক বেড়ে যায়। এ জন্য কোন জাতীয় সরকারের প্রধান দায়িত্ব হলো নিজের দেশের পণ্যের হেফাজত করা, তাকে প্রাধান্য দান করা এবং তার ব্যাপার পক্ষপাতমূলক কর্মপন্থা গ্রহণ করা (অর্থাৎ বিদেশী পণ্যের উপর অধিক কর ধার্য করা) এর মধ্যে দ্বিতীয় চিন্তাধারাটি থেকে অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক হিংসা-বিদ্বেষের গন্ধ ভেসে আসে। প্রথম চিন্তাধারাটি সঠিক হলেও এর সমর্থক বিজাতিসমূহের কর্মধারা, এ নীতির প্রতি চরম বিশ্বাস ঘাতকতাপূর্ণ। তারা নিজেদের জন্য অধীনস্থ বিভিন্ন জাতির সাথে দ্বিতীয় চিন্তাধারার প্রবক্তাদের চেয়েও অধিক পক্ষপাতিত্ব দ্বারা নিজেদেও স্বার্থোদ্ধার, এমনকি অধীনসস্থ জাতিগুলোকে ধ্বংস করার কূট-মতলব নিয়েই অবাধ বাণিজ্য-নীতি সমর্থন কওে থাকে। গণতান্ত্রিক রাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদ বা সাম্রাজ্রবাদ, যারা গণতন্ত্রেও কথ বলেন তাদের বাণিজ্য-নীতিই এই অভিমতের জলন্ত প্রমাণ। আসল কথা হলো ব্যবসা-বাণিজ্যের নামে সাধারণ মানুষের দুরাবস্থা ঘৃণ্য পুঁজিবাদকে মদদ জুুগিয়ে থাকে, এতে সম্পদ একটা বিশেষ শ্রেণীর হাতে পুঁজিভূত ও কুক্ষিগত হয়”। ব্যবস্-বাণিজ্য, ব্যাংকিং ইত্্যাদিসহ অর্থনৈতিক লেনদেনের সব ক্ষেত্রে সুদ নামের শোষণমূলক ব্যবস্থাটি জুড়ে দেয়া হয়েছে, যা কিনা রীতিমত জুলুম । এতে ধনী দেশগুলোর চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দরিদ্র দেশগুলো। করণ তাদেরই ঋণের বেশি প্রয়োজন। তাই চড়া সুদসহ পুঁজিবাদীদের কাছ থেকে তাদের ঋণ নিতে হয় কঠিন শর্তে।
একদিকে রয়েছে পুঁজিবাদী বিশ্বের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক শোষণ, অপরদিকে গুটিকতক লোকের হাতে সম্পদ পুঁজিভূত হওয়ার কারণে দরিদ্র দেশের অধিকাংশ লোক চরম আর্থিক সংকটে মানবেতর জীবনযাপন করছে।