আমাদের নিত্য-নৈমিত্তিক
‘কুত্তার বাচ্চা! ভাত-কাপড় দিবার পার না, তো বিয়া করছে ক্যান? ক্যান করছো? পোলাপানের কাপড়-চেপড় দিবার পারবা না, হেইলে জন্ম দিছো ক্যান? বেশ্যাপাড়া যাইয়া কাম চালাইলেই তো অইত। বিয়া করনের কাম আছিল কি?
“বাবা ঈদে সবাই কাপড়-চোপড় কিনলো, আমাগো কিছু কিনলা না? রহিমের লাল জামা আর টুপি কিনে দিছে, আমারে তো কিছু দিলা না?”
‘মা, ওগো বাড়িতে শবেবরাতের রুটি-হালুয়া রানছে, আমাগো রানবা না?’ বাংলার বধু বাংলার সন্তানের এই ক্ষেদ উক্তি আর আবদার কোনো নতুন কখা নয়। কেন বাংলার বধুর মুখে প্রাণপ্রিয় স্বামীর প্রতি এই কটুক্তি! কেন অবুঝ শিশুটির এই আবদার? অপদার্থ স্বামী, হতভাগ্য পিতা আর দুঃখিনী মার তখন কী জবাব? ওদের মুখ ঊহৃ করে দিয়েছে এই সমাজ। আর যাঁতাকলের দুই চাকার মাঝে ময়দা পিষার মত পিষছে যুগ-যুগান্তর ধরে। প্রতিবাদের ভাষ্য নেই, অধিকার আদায়ের সামর্থ নেই, নিজেদের অধিকার সম্বন্ধে ওরা সচেতন নয়, ওরা ঘুমিয়ে আছে সৃষ্টির আদি থেকে। কোন যাদুর কাঠির পরশে কোন দিন ওদের ঘুম ভাঙ্গবে না, কারণ ওরা কোন রাজতকুমারী নয়, অথচ বাস করে যাদুনগরে। নগরীর প্রাচীর এত শক্ত, এত মজবুত যে, ওদের শক্তি এর কাছে নিতান্ত তুচ্ছ। যাদুনগরের রাক্ষসগুলো চেটে চেটে ওদের কৃশকায় করছে দিন দিন। রাক্ষসগুলো যেমন ভদ্র তেমনই বুদ্ধিমান, একেবারে খেয়ে ফেলে না, কারণ খাওয়া শেষ হলে তারপর খাবে কি? ওরা যে পরম স্বাদ পাচ্ছে সে স্বাদেও কারণেই কোন রকমে বাাঁচিয়ে রাখছে স্বাদু আহারগুলোকে। বুদ্ধিমান রাক্ষসগুলো একবারে খায় না, খুব ভদ্রভাবে চাটে, কারণ রাক্ষসের চেয়ে আহারের সংখ্যা অনেক বেশি। একবাওে খেতে গেলে, সব আহারগুলো এক হয়ে যদি রাক্ষসগুলোকেই খেয়ে ফেলে তাহলে উপায়? তাই যাদুর পরশে ঘুমিয়ে রেখে আস্তে আস্তে রক্ত চোষার মত চুষছে কৌশলী আর বুদ্ধিমান রাক্ষসগুলো।
হে বৃষক ভাইয়েরা, তোমরা কি দেখো না যে তোমাদের উৎপাদনক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধক শাসকগোণ্ঠী। তোমরা যে ট্যাক্স, খাজনা ইত্যাদি দিয়ে থাক, এই ট্যাক্স-খাজনা গ্রহণ কওে তারা পাকা বাড়ি বা দালানে বসবাস কওে, গ০াড়িতে আরোহণ কওে চিকন চাউলের ভাত খায়, মুরগীর রোস্টেও স্বাদ, সাথে তরল উত্তেজক পানীয়, রং-বেরংয়ের পোশাক, দামি সুগন্ধীর ব্যবহার তাদের নিত্য শখ। আর তোমাদের পিঠের চামড়া রৌদ্রে পুড়ে কালো হয়ে যায়, বৃস্টিতে ভিজে অসুখ হয় কাজের শেষে বাড়িতে ফিরে ও মোটা চাউলের পান্তা ভাতের সাথে কাঁচা পিয়াজ বা মরিচ! তোমরাতো চোখ বাঁধা কলুর বলদ ইর, তোমরাও তো সৃষ্টির সেরা মানুষ এবং শ্রমের সাথে সরাসরি জড়িত। তোমাদের স্ত্রীদেও তো ব্রেসিয়ার-পেন্টি, মেয়েদের সালোয়ার-কামিজ আর হাতকাটা ব্লাউজ নেই। এরক টুকরো মোটা কাপড়ও তো ঠিকমতো জোটে না তোমাদের! তোমাদেও সন্তানেরা যে বয়সে স্কুলে যাবে, তখন কিনা নরম হাতে শক্ত লোহার কাস্তে নিয়ে চলে যায় মাঠে কাজ করতে। মাটির মানুষ, তাই বুঝি মাটির সাথে এত সম্পর্ক! হে অবহেলিত কৃষকগণ। তোমারা সুখ-শান্তির জন্য যে খজনা-ট্যাক্স প্রদান কর, তা ব্য হয় রাজনিিতবিদদেও নির্বচণে, দল বা ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্যে, তোমাদের হাড়ভাঙা খাটুনির পয়সা দিয়ে দেয়ালে শোভা পায় রং-বরংয়ের পোস্টার। এ কার রাজনীতি এ কার রাজনীতি? কিসের রাজনীতি? কার জন্য এই ভন্ড রাজনীতি?
সাধালণ মাুষের দুঃখ দুর্দশা ঘুচানোর ভ’য়া কথা তোমাদেও টাকায়ই শুনানো হয় তোমাদের। তোমরা দেখ না? ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য চোর, ডাকাত,গুন্ডা হাইজ্যাকার পালা হয় তোমাদের প্রদেয় অর্থে। ক্ষমতালোভী হায়নাগুলোর গাড়ি, বাড়ি, বিলাসবহুল আসবাবপত্র, প্রয়াত নেতাদের স্মৃডুসৌধের ম্জোাইক পাথর দিয়ে তো তোমাদেও রখেÍর গন্ধই পাওয়া যায়। উচ্চ হারের সুদ, উচ্চ মূল্যের কৃষি যন্ত্রপাতি,উন্নয়নের নামে ব্যাপক প্রচার করে তোমাদের দেয়া হয়,একবারও কি হিসাব মিলিয়ে দেখছো কত খরচ আর কত আয়? খাজতনার চেয়ে বাজনা বেশি। কতকাল আর অশিক্ষিত চাষা হয়ে থাকবে? কতকাল আর করবা জীবন বাঁচানোর সংগ্রাম। তোমাদের ঘুম কি এখনও ভাঙবে না! জানালা দিয়ে বোরের সূর্য তোমাকে ডাকছে, লোহার কাস্তেটা একটু শক্ত করে ধর। উঠতে কষ্ট হচ্ছে তাই না? সারা দিন কাজ কওে পেটভওে দুটো খেতে পার নাই, মাটির শরীর মাটির সাথে মিশে গেছে। কিন্তু ভোরের বাতাস যে তোমাদেও ভাগ্যে ইেন ওটা ছিনিয়ে নিয়েছে শোষকরা। তোমাদেও তো শুধু কাজ আর কাজ। ভোর হলেই তো ডাক আসে মাঠের। ছিন্ন বস্ত্র, হাতে ভোতা কাস্তে, পেটে পান্তা ভা তবা শকনো রুটি। কাস্তে খানা একটু ধারালো কর া না। ক’দিন পওে তো লোহওু পাবে না, ওগুলো এখন বড় বড় দালানের রড, পাবে না দুপুরের রৌদ্রে, একটু গাছের ছায়া, গাজগুলো লাগছে ইমারতের ইট পোড়ানোর কাজে? মাটিতেও ইট হয়, তোমরাতো মাটির মানুষ, মাটির বন্ধু দেখছো না মাটিগুলো কিভাবে মেশিনে দিয়ে নরম মোলায়েম কওে বাক্সে ভওে তৈরি হচ্ছে ইট। রৌদ্রে শুকিয়ে তারপর লাল টকটকে হচ্ছে ভাটায়। ঐ মাটির সাথে, হে মাটির বন্ধু তোমাদের আর ভাটায় যেতে কতদিন বাকি?
ঘায়রে কবি! তোমার বাংলার বধু আজ কোথায়? তার পরনে যে কাপড় নেই, মাথায় নেই তেল, কাঁখে নেই পিতলের কলসি, অকলে হয়েছে বৃদ্ধা, তাই তোমার কবিতা-
‘বাংলার বধূ বুক ভরা মধূ
ঘাটে যেতে প্রাণ কওে আনচান’
আজ মরতে চলেছে, তুমি তো দেখতে পারলে না, আমরা চোখ ভরে দেখছি আর মনে করছি তোমার কবিতা। সত্যি কি তুমি কল্পনায় দেখেছিলে বাংলার বধুকে না বাস্তবে?
হে বরেণ্য কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র, তুমি দেখে যাও তোমার মহেশ-গফুর হওয়ার পর কি অবস্থা! আর যদি দেখতে না পার, তবে শোন ভ’পেন দা কি বলছে তার গানে-
করৎ বাবু লিখে দিলাম চিঠি
তোমার মহেশ পায় না খেতে……।
একজন ঠ্যাং কাটা বা পঙ্গু ভিক্ষুকের মত দুই হাতে দুটো ভর বা ক্রাচ অবলম্বন? ভিক্ষার ঝুলি হাতে রাখার সামর্থ নেই বলে গলায় নিয়ে আর কত দ্বারে দ্বারে ঘুরবে। দ’হাতে কাঠের পায়ে ভর আর গলায় ছোলা নিয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে না ঘুরে ফেলে দাও ঝোলা, ভর কর এক হাতে আরেক হাতের অবলম্বন সোজা করে ধর শোষক গোষ্ঠীর মাথার দিকে। তোমার প্রাপ্য আদায় কর, আর করুণা ভিক্ষা করার প্রয়োজন নেই আর না পারলে মাথা ঠুকিয়ে মর ওদের ইমারতের শক্ত ইট্রে সাথে, আর রক্ত দিয়ে লেখে দাও “আমরা পরাজিত” মানুষ হয়ে মানুষের কাছে করুণা ভিক্ষার চেয়ে মাথা ঠুকে মরাও অনেক ভালো।
হে বেকার সমাজ, যাদের নিজের গাড়ি-বাড়ি, শিল্প-কারখানা আছে, দোকানপাট আছে, আয়ের বিভিন্ন উৎস আছে, তারা উচ্চতপদস্থ কর্মকর্তা, তারা উচ্চ বেতন ভোগ করছেন আর তোমরা রাজপথে ঘুরছো। তাদের যেহেতু আয়ের পথ আছে তথাপিও বাড়তি আয়, াার রাজপথে পার্কের বেঞ্চে বসে তোমাদেও কত রঙ্গিন কল্পনা। একদিন দেখবে তোমাদেও চতাকরিরর বয়স শেষ, তারপর………?
হে বাংলার অভাব আর দারিদ্র্যক্লিস্ট মানবসমাজ! ঈদের আনন্দ আর আয়োজন দেখেছো? জর্দা-ফিরনি আর পোলাওয়ের ঘ্রাণ পেয়েছো? দেখেছো রং-বেরংয়ের পোশাকের ঝলকানি আর গহনাপত্রের ঝনঝনানি? গাড়ি আর ফর্নিচার বদলানোর বাহার। বড় বড় মার্কেটগুলোতে ধনীর দুলারীদের ভিড়! তোমরা না ঠেলাগাড়ি আর রিক্সায় বয়ে দিলে এসব বিলাসী সমগ্রী। তোমাদের স্ত্রীরা অর্থ্ৎা বাংলার বধূরা রান্নাঘওে পিষল মসলা, ধুয়ে দিল কাপড়-চোপড়, পরিষ্কার করে দিল দামি কাচ আর চিনামাটির প্লেটগুলো, তারপর সেগুলো ডাইনিং টেবিলে সাজিয়ে রেখে চলো আসতে হলো।
মাথা গোঁজার ঠাঁই ছনের কুড়েঘরে, দেখতে হলো পুষ্টিহীন ভ’খা শিশুগুলোর মুখ, খাবার তৈরি করেও জুটল না কপালে। জুটবে কি করে? গাড়ি নিয়ে দামি কাপড় চোপড় পড়ে আসবে ধনী মেহমানেরা। ওদের পেটে তো আর শুকনো রুটি আর মোটা চাউল সইবে না। খাওয়াদাওয়ার পর ঝুটকাটা যদি কিছু থাকে তা করুণা করে দিতে পারে। তোমাদেরকে ঝুটকাটা দিয়ে ছওয়াব কামাতে অসুবিধা কোথায়? তোমাদের সন্তানেরা নতুন কাপড় পেয়েছে? তোমাদেও বধুরা পেয়েচে একটু করা মোটা কাপড়? যুবতী মেয়েরা তো ঘর থেকে বেরুতে পারছে না, ওদের যৌবন উঁকি মারছে ছেঁড়দা কাপড়গুলোর ফাঁক দিয়ে। যৌবন ঢাকার কাপড়ও তো জুটছে না ওদের ভাগ্যে।
রাস্তায় বেরুলে কি কওে, রক্তপিপাসু কুকুরগুলো যে চেয়ে থাকে আড়চোখে। ওদেও চোখে যে সর্বনাশের নেশা। মনে রসনার লোলুপ বাসনা। ওরা তাহওে যাবে কোথায়? মাটির সন্তান মাটির সাথে মিশে থাকারও যে নিরাপত্তা নেই। এ নিয়ে দুঃখ কওে কোন লাাভ নেই,আবেদন-নিবেদন সবই বৃথা। যদি প্রাপ্য পাওনা আদায় না করতে পার,ত তাহলে শুধু উপরতলার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ-শ্বাস ফেলে কোন লাভ নেই। তোমরা তো সমাজের আবর্জনা। তোমাদেরকে পরিষ্কার কওে সমাজটাকে পরিচ্ছন্ন করার সংগ্রামেই তো ওরা লিপ্ত। ওমর খৈয়াম নাকি আল্লাহকে বলেছিল, “দুনিয়াতে মানুষ সাদা-কালো, বেটে-লম্বা, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ছোট-বড়, ধনী-দরিদ্র কেন? এসো সুন্দর মাটি দিয়ে একটা সুন্দর সুশ্রী অভিন্ন মানুষের সমাজ গড়ি”। ওমর খৈয়াম হয়তো দেখেছিলেন তাঁর গভীর হৃদয় দৃষ্টি দিয়ে মানবসমাজের অসাম্য, তাই দুঃখা কওে সৃষ্টিকর্তার কাছে রেখেছিলেন এই আবেদন। ওমর খৈয়াম বেচারা বোধ হয় পাগল ছিলেন।
“হে মানব! কতদিন থাকবা আর যন্ত্রদানব
তুমি তো দানব নয় আসলে মানব।”
আমার কথায় কোন একটি মানুষ যদি সচেতন হয়, সে যদি শোষণ-নির্যাতন জুলুম আর অত্যাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার কন্ঠে বলে “আর ঘুম নয় এবার জাগার পালা।” তাহলে আমার চিন্তা আর পরিশ্রম কিছুটা সার্থক হবে।
আমার বিশ্বাস, আমার এ লেখা না পড়ঔের ঘুমন্ত মানুষ শোষন, নির্য়াতন, নিপীড়ন, জুলুম আর অত্যাচারের নাগপাশ থেকে শৃঙ্খলমুক্ত হয়ে বেরিয়ে আসবে একদিন। ভোরের সোনালি সূর্যে পৃথিবীর মানুষ একদিন মুক্ত হবেই। কিন্তু গল্পকথার রাজতকুমারের যাদুর কাঠির পরশে নয়-যেদিন ওদের উপলব্ধির দরজা খুলে যাবে, ওদেও ন্যায্য অধিকার বুঝথতে পারবে, চিহ্নিত করতে পারবে অধিকার হরণকারীদের। সেদিন ভেঙে দিবে রক্ত চোষার বিষ-দাঁত। যে দিন তরবারির আঘাতে খন্ড-বিখন্ড হয়ে যাবে ঐ সমস্তক দানব। সেদিন রচনা হবে “একটি সুন্দও পৃথিবী। আমি আছি সেদিনের অপেক্ষায়।”