আমাদের চলচ্চিত্র

প্রথমেই কাহিনী। কাকে দিয়ে কাহিনী লেখানো যায়? ঠিক হলো একজন নামকরা কাহিনীকারকে দিয়ে কাহিনীটা লোখানোর। ইতোমধ্যেই একজন পরিচালকও ঠিক হয়ে গেল। কাহিনীকারের সাথে প্রযোজক হিসেবে আমার বসা দরকার। আমি কেমন কাহিনী চাই, কোন নায়ক-নায়িকা থাকবে ইত্যাদি ইত্যাদি। একদিন বসার তারিখ ঠিক হলো। কোথায় বসব? পরিচালক সাহেবকে বললাম, আমার বাসায় বসলেই তো ভালো হয়। বাসায় সিনেমার কাহিনী নিয়ে বসা ঠিক হবে না। ভাবি-বাচ্চার আছে। এর চেয়ে একটা হোটেলে রুম নিয়ে বসা যায়। পরিচালক সাহেবের এ কথায় আমিও নির্ঝঞ্জাট মনে করে রাজি হয়ে গেলাম। পরিচালক সাহেব বসার দিনের বাজেট করলেন পাঁচ হাজার টাকা। শুনে ‘থ’ হয়ে গেলাম। এত টাকা লাগবে কেন? একটা রুম ভাড়া দুই আড়াই’শ টাকা, সিগারেট আর না হয় একশত টাকা, এর বেশি আর কত। পরিচালক সাহেব জানালেন। আরে ভাই, ফিল্ম হলো গিয়ে লর্ডস-এর ব্যবসা, এখানে যেমন খরচ তেমন আয়। তা এত খরচ হবে কি ভাবে? নতুল মানুষ তো আস্তে আস্তে  বুঝবেন। প্রডাকশন ম্যানেজারের কাছে টাকাটা দিয়ে দিবেন, ্ওই সব ব্যবস্থা করবে। আপনি সময় মত চলে আসবেন, আমি কাহিনীকারকে নিয়ে আগেই উপস্থিত থাকব। পরিচালক সাহেবের এ কথায় রাজি না হয়ে পারলাম না। পরের দিন একজন লোক পাঠালেন, জানলাম ইনিই আমাদের প্রডাকশন ম্যানেজার। টাকা দিয়ে দিলাম। নির্ধারিত সময়ে হোটেল কক্ষে হাজির হয়ে দেখলাম কাহিনীকার, পরিচালক, প্রডাকশন ম্যানেজার, আরও দুইজন সন্দরী, বব-কাট, অর্ধউলঙ্গ মেয়ে, টেবিলে দুটো মদের  বোতল্ বেশ জমেছে। এরা কারা? পরিচালক সাহেব বললেন, ইনি হলেন কাহিনীকার জনাব অমুক। আর ইনারা হলেন, যে ছবি বানাতে যাচ্ছি তার কিছু দৃশ্যে অভিনয় করবেন, অর্থাৎ এক্সট্রা। আপাতত: আমাদের এখানে গেস্ট। তা ছাড়া আপনারা খেদমতেও ধরা চলে। মহিলা দুইজন সালাম দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। বসতে বলে আমিও বসে পড়লাম সোফায়। শুরু হলো মদ আর মেয়ে-মানুষ দিয়ে প্রডাকশন। শুরুও প্রথমেই কাহিনী। কী রকম ছবি চাই? কাহিনীকারক প্রশ্নের সাথে সাথেই একঢোক গিলে গ্লাসটা টেবিলে রাখলেন। বললাম, গ্রাম বাংলার সাধারণ মানুষের জীবন  নিয়ে বাস্তবধর্মী একটা সামাজিক ছবি। কাহিনীকার আর এক ঢোক গিলে  বললেন, তা তো বুঝলাম- আমি বলছি করটা ড্যান্স, কয়টা ফাইট, আর কয়টা গান। সমাজসেবা করলে তো আর ব্যবসা হবে না। ছবিতে মাল চাই, নইলে তো একেবারে ডুববেন। পরিচালক সাহেব কয়েকটা ড্যান্স, ফাইট, গান টপাটপ বলে ফেললেন। কাহিনীকার ওকে হলো। প্রডাকশন একটা বানানোর কাহিনী আনন্দ-ফুর্তি আর খরচা দিয়ে অনেক দুর এগিয়েও নায়ক মহাশয়ের গাফিলতির কারণে ছবিটি আর মুক্তি পায়নি। তবে কাহিনীকার আর পরিচালক সাহেব মাল দিয়েছিলেন ভালো, যাতে দর্শকের সড়সুড়ি লাগে আর হুড়হুড় করে হলে ঢোকে। একটি মাধ্যম এবং শক্তিশালী গণমাধ্যম মদ আর মেয়ে-মানুষ দিয়ে হলো শুরু! পর্দায় হবে মারপিট, প্রেম-প্রেম খেলা, উলঙ্গ নৃত্য আর গল্প, এরই নাম এদেশের একটি সাংস্কৃতিক শিল্প। আর এ শিল্পটি এভাবেই চলছে দীর্ঘদিন ধরে, আর কতদিন চলবে কে জানে। ফিল্ম বানানোর সাধ মিটে গেল।

Comments (0)
Add Comment