উল্টো ধারা

“সব কিছু মানুষের জন্য, সমস্ত কিছু তারই কল্যাণে”। আজ যদি আমরা বিশ্বের দিকে তাকাই তাহলে দেখব, সমস্ত কিছুই বিত্তশালীদের জন্য, সমস্ত ব্যবস্থাই তাদের কল্যাণের উদ্দেশ্যে। আমরা যদি মৌলিক অধিকারের প্রশ্নে যাই তবে দেখব তাও ধনী শ্রেনীরই স্বার্থে। মেহনতী মানুষের কাছে বিনোদন একপ্রকার বিলাসিতা। খোলা মাঠে বা পার্কে তাদের বিনোদনের কোন সুযোগ নেই। কারণ পার্কগুলো সবই শহরকেন্দ্রিক। শারীরিক বিনোদনের পরিবর্তে ধনিক শ্রেনীর মানসিক বিনোদন আজকাল টেলিভিশন আর ডিভিডির সামনে। ঘরে সবেই তাদের  সুযোগ রয়েছে বিশ্বের সকল প্রকার বিনোদন উপভোগ করার। মৌলিক প্রয়োজন গুলো মানবিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা না করে তা আজ বিশেষ শ্রেনীর জন্য সংরক্ষিত অধিকার বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। দারিদ্র্যতা ও মেহনতী মানুষকে করে দিচ্ছে নির্জীব। আর এই নির্জীবতা ও অসহায়তা থেকে হতাশা সৃষ্টি হয়ে থাকে। হতাশা আর নিরাশাই জাতিকে পর্যুদস্ত  করে বিভিন্ন দল সৃষ্টির কারণে জাতীয় ও সামাজিক স্বাধীনতা হয়ে বিপন্ন। অপরদিকে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারিরা রাজনীতিমুক্ত না হওয়ার কারণে নিরপেক্ষ প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভবপর হয় না। দরিদ্র বিশ্বের মেহনতি মানুষ দারিদ্র্যতার কারণে সংঘবদ্ধ হতে পারে না। তাছাড়া বহুদল সৃষ্টির কারণেও তাদের  মধ্যে একতা নেই, অথচ ঐক্যবদ্ধ, সংঘবদ্ধ ও সুসংহত হবার ফলে মানুষের মধ্যে শক্তির সঞ্চার হয়, আর এই শক্তিই খুলে দেয় কর্মের রাস্তা।
বর্তমান বিশ্বের উন্নয়নের নামে গরিব মানুষকে ভূমি থেকে উচ্ছেদ করে ধনিক শ্রেণীর বিলাসিতার জন্যে গড়ে তোলা হচ্ছে সুরম্য অট্রালিকা। মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণের সুযোগ সীমাবদ্ধ থাকার কারণে বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে দিন দিন।
তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশই বলছে, নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার হলো এক ধরনের বিলাসিতা এবং মৌলিক ও বৈষয়িক চাহিদাপুরুণ হলেই কেবল তা ভোগ করা হয়। মানবতার কাছে এই অগ্রহণযোগ্য বক্তব্য থেকেই মানবিক অধিকার আজ কোন পর্যায়ে তা সহজেই অনুমেয়। বিশ্বের কোথাও যেন আজ ধর্মীয় বিধি-বিধানের দ্বারা নৈতিক দিক নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে না। অথচ এই নৈতিক বিষয়টিই আজ ভেবে দেখার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এর কোন বিকল্পও নেই। কারণ রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থা যখন সুদৃঢ় তখন আইন-শৃঙ্খলা এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাও উন্নত হয়। এর ফলে যে কোন জাতীয় সফলতাও স্থির নিশ্চিত হয়। শান্তি ও নিরাপত্তার স্বার্থে বিষয়টি যে কত গুরুত্বপূর্ণ তা বোধ হয় আর ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই। আমরা যদি মেহনতি মানুষের বিশ্রামের অধিকারের দিকে তাকাই তা হলে গণতন্ত্রীদের পরস্পর বিরোধী বক্তব্য লক্ষ্য করা যায়। বুর্জোযা প্রচার ও বুর্জোয়া সাজ বিদ্যা আধুনিক পুঁজিতন্ত্রকে এমন এক সমাজ হিসেবে দেখতে চায় যেখানে রয়েছে ব্যক্তির পূর্ণ আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার।
তারা আপন আপন উপায়ে ব্যাখ্যা করে, বিশ্রামের অধিকার, অবসর সময়ের অধিকার ইত্যাদি। তা নাকি মানুষের “একাকীত্বের স্বাধীন” সময় সমাজের সঙ্গে, পারিবারিক এবং পেশাগত ব্যাপার স্যাপারের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের পূণ বিচ্ছেদেও সময় এবং এই কথাটি বলার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই জোর দিয়ে ঘোষনা করা হয় যে, ঠিক সেই স্বাধীনতাটারই অভাব দেখা যায় সমাজতান্ত্রিক সমাজে। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে ‘সবাই স্বাধীন একাকীত্বের’ এবং পূর্ণ আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার সম্পর্কিত বাগাড়াস্বরের উদ্দেশ্য শুধু বুর্জোয়া  সমাজের সবচেয়ে জঘন্য দিকসমূহ তার যৌন তান্ডবলীলা আর বর্বর রীতি-নীতিগুলো গোপন করা নয়, বুর্জোয়া সমাজে কর্মদাতা বা রাষ্ট্র থেকেই যে মেহনতি মানুষের বিশ্রামের বিষয় ভাবিত নয়, সে কথা সর্বজন বিদিত। যার পেটের চিন্তা তার আবার বিশ্রাম আর বিলাসিতা!

Comments (0)
Add Comment