পশ্চিমা গণতন্ত্র ও একনায়কতন্ত্র

এই পশ্চিমা গণতন্ত্র জনগণের কোনই কল্যাণ বয়ে আনতে পারেনি। প্রশ্ন আসতে পারে ত’হলে সমাজ তন্ত্রই মানুষের কল্যাণ নিহিত? না তাও নয়। কারণ সমাজতন্ত্রে মানুষের ব্যক্তি স্বাধীনতা হরণ করে মানুষকে শ্রম-যন্ত্রে পরিণত করে। মানুষ শুধু কাজ করবে, কাজ অনুযায়ী পারিশ্রমিক পাবে। এর পর সমাজতন্ত্রের চরম অবস্থা। কমিউনিজমে মানুষ সাধ্য অনুযায়া কাজ করবে, প্রয়োজন অনুযায়ী ভোগ করবে। আর এই প্রয়োজনও রাষ্ট্র কর্তৃক নির্ধারিত হয়। এতে ব্যক্তিবর্গের কোন আশা-আকাক্সক্ষার মূল্য দেয়া হয় না। সাধ্য অনুযায়ী ভোগের নিশ্চয়তা থাকার কারণে উৎপাদিত প্রতিযোগিতার সৃষ্টি না হওয়ায় স্থবিরতা দেখা দেয়। এর ফলে অর্থনীতি ভেঙ্গে পড়ে। অর্থনীতির এই চরম অবস্থার শিকার হয়েই বৃহৎ সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সোভিয়েট ইউনিয়ন ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে, যা আমি আগেই উল্লেখ করেছি। সমাজতন্ত্রের সমবন্টন ব্যবস্থা মূলত সুষমবন্টন ব্যবস্থা নয়। রাষ্ট্র যদি নাগরিকদের  সকল বিষয়ের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তবে মানুষ তাঁর কর্ম-প্রেরণা হারিয়ে ফেলে। কারণ সমাজতন্ত্রে ব্যক্তি মালিকানার স্বীকৃতি নেই। আর ব্যক্তি মালিকানা না থাকলে উৎপাদন প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয় না। শ্রমজীবী যতই উৎপাদন করুক, রাষ্ট্র কর্তৃক নির্ধারিত প্রাপ্য ছাড়া সে বেশি কিছু আশা করতে পারে না। নিজের পরিশ্রমের উৎপাদিত পণ্য রাষ্ট্রের হাতে তুলে দিয়ে রাষ্ট্রের আজ্ঞাবহ হওয়া মানুষের পছন্দ নয়। জাীবনোপায়ে বৈষম্য না থাকলে প্রতিযোগিতার মনোভাবও গড়ে ওঠে না।
সমাজতন্ত্রে মানুষের ভিন্নমত পোষণের অধিকার নেই। ভিন্নমত পোষণকারীদের শাস্তিমূলক কঠিন শ্রমে নিয়োজিত করা হয়। সকল প্রকার নাগরিক সুবিধা থেকে তাকে করা হয় বঞ্চিত । ব্যক্তি মানুষের উপর এহেন নিয়ন্ত্রণ মানুষকে দাসে পরিণত করে। তাছাড়া পুঁজিবাদীর গর্ভেই সমাজতন্ত্রের জন্ম হওয়ায় পুঁজিবাদী চরিত্র সব সময়ই তার অসচেতন মনে লালিত হতে থাকে, যা স্বয়ং মার্কস ও লেলিন স্বীকার করেছেন। ক্ষমতা শ্রেণীকরণের জন্য মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হয়। শ্রেণীহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বুর্জোয়া শ্রেণীর সম্পদ রাষ্ট্রের হাতে নিয়ে যাওয়া হয়। সর্বহারা শ্রেণীর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার কথা বলা হলেও  মূলত কয়েক ব্যক্তি ছাড়া কারুরই কোন কর্ত্বত্ব বা নেতৃত্ব থাকে না। একনায়কতন্ত্রে ব্যক্তি বিশেষের উপর অর্পিত হয় অসীম ক্ষমতা, শুধু রাষ্ট্র নায়কের ইচ্ছার উপরই রাষ্ট্র পরিচালিত হয়। ফলে সাধারণ মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতি গুরুত্ব দেয়া হয় না। এই কারনে মানুষ এ ব্যবস্থাটিকে অমানবিক এবং স্বেচ্ছাচারী ব্যবস্থা বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
প্রচলিত গণতন্ত্রে মানুষের অর্থোপার্জন আর ভোগের অবাধ স্বাধীনতা থাকায় সে শালীন-অশালীন পন্থায় অর্থ উপার্জন করতে থাকে। মানুষের আয় ও ব্যয়ের উপর রাষ্ট্রের কোন প্রকার নিয়ন্ত্রণ না থাকায় এক শ্রেণীর মানুষ পুঁজির পাহাড় গড়ে তোলে। আর এক শ্রেণীর মানুষ হয়ে যায় সর্বহারা । সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রতিনিধিরা সরকার গঠন ও রাষ্ট্র পরিচালনা করে থাকেন। নির্বাচনে একশ ভোটের মধ্যে যিনি একান্ন ভোট পাবেন তিনিই নির্বাচিত প্রতিনিধি হন। অবশিষ্ট ৪৯ জন লোকের মতামতের কোন মূল্য দেয়া হয় না। একই ভাবেই জনপ্রতিনিধিদের  নিয়ে যে সংসদ তাতে দলীয়  সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে তারাই সরকার গঠন করে, বিরোধী ও স্বতন্ত্রী হয় বঞ্চিত। ক্ষমতাসীন কোন দলের সাংসদ কোন বিলে দলের বিপক্ষে ভোট দিলে তার সদস্য পদ বাতিল হওয়ার বিধানও অনেক দেশের সংবিধানে জুড়ে দেয়া হয়েছে। ক্ষমতাসীন দল তাদের সুবিধা মত সংবিধান সংশোধনের ব্যবস্থা করে থাকেন। এক্ষেত্রেও জনগণের মতামতকে পরিপূর্ণভাবে মূল্যায়ন করা হয় না।
তাছাড়া একনায়কতন্ত্র, ফ্যাসিজম, সমাজতন্ত্র, গণতান্ত্রিক রাজতন্ত্রসহ বর্তমান বিশ্বের গড়া পশ্চিমা কোন তন্ত্রই মানুষের পরিপূর্ণ মুক্তি আনতে পারেনি। এসব ব্যবস্থায় ক্ষমতাসীনরা প্রশাসনকে তাদের অধীনস্থ বানিয়ে বিরোধীদেরকে দমন নির্যাতন ও নিপীড়ন করে থাকে। প্রচলিত সব তন্ত্রই কোন না কোন গোষ্ঠীর স্বার্থে ব্যবহার হয়। এসব তন্ত্রের মধ্যেই রয়েছে শোষণমূলক বিধি-বিধান। যেখানে শোষণ আর শাসনের প্রশ্ন সেখানে কল্যাণ আর সেবার প্রশ্ন অবান্তর। অথচ সেবা আর কল্যাণমুখী রাজনীতি ছাড়া মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়।
ন্যায়-নীতি ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা ছাড়া কোন তন্ত্র বা ইজতমই সাধারণ মানুষের মুক্তি আনতে পারে না। এখানে স্বভাবতই প্রশ্ন আসতে পারে তাহলে কিসে সমগ্র মানুষের মুক্তি নিহীত?

Comments (0)
Add Comment