বাংলাদেশের একটি গ্রাম্য চিত্র

তৃতীয় বিশ্বের একটি দরিদ্র দেশ বাংলাদেশ, এ দেশের গ্রামে গণতান্ত্রিক সরকার এবং গণতন্ত্রের সংসদীয় পদ্ধতি চালু রয়েছে। এই অঞ্চলের মানুষের জীবিকা অর্জনের প্রধান অবলম্বন হলো কৃষি কাজ। নগদ অর্থের উৎস হলো ধান, পাট ও আখ। গ্রামের শতকরা ৮০ জন লোক দরিদ্র ও দিনমজুর । ১০জন ভাগ বা বর্গাচাষী, ৫জন নিচু মধ্যবিত্ত, ১ জন ব্যবসায়ী, ২জন সরকারি চাকুরে, ২ জন ধনী কৃষক। ধনী কৃষকেরা কৃষি কাজের পাশাপাশি কৃষিজাত পণ্যের ব্যবসার সাথে জড়িত এবং পণ্যের মজুদধারীও করেন। তাদের চাষাবাদ যান্ত্রিক। নিু মদ্যবিত্তরা হাল-গরু এবং মাঝে মধ্যে ভাড়ায় যান্ত্রিক চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করে। শিক্ষিতের হার পুরুষের মধ্যে ৩০ ভাগ এবং মেয়েদের মধ্যে ১০ ভাগের বেশি হবে না। কৃষকরা তাদের পণ্যের সঠিক মূল্য পায় না। অনেক সময় ক্ষেতে থাকতেই অর্ধেক দামে মহাজন ও ফরিয়াদের কাছে আগাম বিক্রি করে থাকে।
অনেকে মহাজনদের কাছ থেকে সুদে টাকা ধার আনে তাই ফসল উঠার সাথে সাথেই মহাজনের হাতে তুলে দেয়। মহাজন তার সুবিধামত দর নির্ধারণ করে থাকে। মহাজনের পাওনা কেটে রেখে যা ফেরত দেয় তা কৃষকের উৎপাদন খরচও দ্রব্যেও তূলনায় খুবই সামান্য। এ দিয়ে পরিবার-পরিজনের কাপড়-চোপড়, ঘর-বাড়ি মেরামত করতে শেষ হয়ে যায়। ছেলে-মেয়ের পড়ালেখা, চিকিৎসা বিয়ে-শাদী আর উৎসবের জন্য তার কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। কোন প্রয়োজনে তাকে মহাজন থেকে ধার-কর্জ করতে হয়।
হাড় ভাঙ্গা খাটুনি করেও তারা সুখে নেই। অপরদিকে ধনী কৃষক যারা ব্যবসার সাথেও জড়িত তারা একদিকে কম দামে পায় শ্রম, যান্ত্রিক চাষে হয় লাভবান। অভাবগ্রস্ত নিু মধ্যবিত্তরা ছেলে-মেয়ের বিয়ে-শাদী ও রোগ-শোকে সামান্য জমিটুকুও বিক্রি করে ধনী কৃষক বা চাকরিজীবিদের কাছে। এভাবে কয়েকজন ধনী কৃষক আরও ধনী হচ্ছে নিু মধ্যবিত্তরা জমি-জমা হারিয়ে দিন দিন সর্বশান্ত হয়ে যাচ্ছে। আধুনিক চাষাবাদের সুবিধা তাদের কোনই উপকারে আসছে না। ভুমিহীন দিনমজুররা নিুতম মানবিক অধিকার থেকেও হচ্ছে বঞ্চিত। সারা দিন শ্রম দিয়ে সামান্য যা মজুরী পায় তা দিয়ে পরিবারের ভরণপোষণ হয় না, ফলে অর্ধাহারে আর অনাহারে দিন কাটে। যখন কাজ থাকে না তখন ধার-কর্জ বা কম দামে অগ্রীম শ্রম বিক্রি করতে বাধ্য হয়। সম্পদ না থাকায় আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকেও তারা ঋণ সুবিধা পায় না। বাধ্য হয় বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা থেকে অধিক সুদে ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ে ছোট-খাট ব্যবসা করতে চেষ্টা করে। ব্যবসায় লাভ হোক আর নাই হোক প্রতিষ্ঠানের ঋণ সুদে-আসলে ফেরত দিতেই াডয়। ঋণ-দাতা সংস্থাগুলো প্রকাশ্যে ১৬% সুদেও কখা বললেও প্রকৃত পক্ষে বিভিন্ন নামে ও খাতে ২৮% থেকে শুরু করে ৪২ পর্যন্ত সুদ নিয়ে থাকে। এমন কৌশলে সুদ নেয় যে, তা নিরক্ষর কৃষক ও দরিদ্র নারীরা বুঝতে পারে না। সাময়িকভাবে লাভবানা মনে হলেও এতে তারা আরাও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এই আর্থিক সুবিধায় তাদের ভাগ্যেও কোনই ইতিবাচক পরিবর্তন হচ্ছে না বরং দিন দিন কঠিন অবস্থায় নিপতিত হচ্ছে। সুদের বোঝা টানতেই তারা দিশেহারা। সেবার নামে ওই সব সংস্থার অর্থনৈতিক শোষণের শিকার হচ্ছে বিত্তহীন ও ভ’মিহীন মেহনতি মানুষ। গ্রামের ভ’ািমহীনের সংখ্যাতো কমছেই না বরং বাড়ছে দিন দিন। তাই উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান গুলোর দরিদ্র নিরসন প্রদেচষ্টা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। গ্রামে দুঃস্থ মাতাদের খয়রাতি গম তারা পাচ্ছে নির্ধারিত প্রাপ্য থেখে অনেক কম। অবশিষ্টটা হজতম করছে জতনপ্রতিনিধি ও দায়িত্ব প্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তারা। প্রতিবাদ করার কোন উপায় নেই, প্রতিবাদ করলে হয় তাদেও কাজ বাতিল হবে, না হয় জনপ্রতিনিধির লোকজন দিয়ে বিভিন্ন ধরনের হুমকি প্রদান করে মুখ বন্ধ করে দেয়। বাধ্য হয়েই যা করুণা করে দেয়,তাই নিতে হয়। দুঃস্থ মাতা বা বিত্তহীনদের ন্যায্য পাওনা আদায়ের জন্য কোন সমাজকর্মী বা সচেতন ব্যক্তি পদক্ষেপ নিয়ে তাকে বিভিন্ন ধরনের মিথ্যা অভিযোগ এনে পুলিশ বা প্রশাসনের লোক দিয়ে হয়রানী করা হয়। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা সর্বদাই এই সব অসৎ জনপ্রতিনিধিদের অপকর্মে সহায়তা করে থাকে। জনপ্রতিনিধি হওয়াই যেন রোজগারের পথ খুলে যাওয়া। সাধারণ মানুষের ভোট নিয়ে তারা তাদের উপরই চালায় জুলুম-নির্যাতন, এভাবে তারা নিজেরা প্রভু সেজে জনসাধারণকে পরিণত করেছে দাসে। তাদের অন্যায় অত্যাচারের প্রতিবাদ করার দুঃসাহস কারও নেই, যেন এরাই জনগণের ভাগ্য বিধাতা।
আরেক শ্রেণীর লোক আছে, যাদের গ্রামে টাউট হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। এদের কাজ হলো; গ্রাম্য হাট বাজারে আড্ডা দেয়া, মেম্বর-চেয়ারম্যানদের পিছে বেড়ানো আর অযথা মানুষের সমালোচতনা করা। এই টউটদের নির্ধিষ্ট পেশা নেই। এদের অনেকে মিথ্যা অভিযোগে নিরীহ লোকজনদের থানা-পুলিশে হয়রানী করে থাকে। মানুষকে একে অপরের বিরুদ্ধে মামলা মোকদ্দমা করতে প্ররোচিত করে। সালিশ বিচারকার্যে পক্ষ-পাতিত্ব করে ঘুষ খায়। অনেকে টাকার বিনিময়ে ধনীদেও পক্ষ হয়ে অন্যেও সাথে মারামারি করে। কাউকে একাধিক বিয়ে-তালাক দিতে এবং যৌতুক দাবি করতে উদ্বুদ্ধ কওে গ্রামের সমস্যাবলী ডৎইয়ে রেখে ফ্যাসাদের সৃষ্টি করে। এরা গ্রামের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নষ্ট কওে জন-জীবনকে দুর্বিষহ কওে তোলে। তারা গ্রামীণ অর্থনীতিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। গ্রামের সহজ সরল মেয়েকে বিপথগামী কওে থাকে। হাট-বাজারে মদ, গাঁজা, জুয়া ইত্যাদি অবৈধ ব্যবসায় সহায়তা করে। চুরি-ডাকাতিসহ সকর প্রকার অসামাজিক কার্যকলাপে এদেও ইন্ধন এবং! জড়িত থাকার প্রমাণও পাওয়া যায়া। ধনী কৃষক আর ব্যবসায়ী যারা আছেন তাদেও চাল-চলন, পোশাক-পরিচ্ছদ উন্নত ধরনের, তাদের সব কিছুতে আধুনিকতার ছাপ। গ্রামে তাদের হাতেই সামাজিক নেতৃত্ব।
অর্থ ও সম্পত্তির মাপকাঠিতে এদের ক্ষমতা বিচার করা হয়। এদের ছেলে-মেয়েদের অনেকেই স্কুল-কলেজে পড়ালেখা কর্ েএই গ্রামে একজন অনেক বড় ধনী লোক আছেন, তার একদিকে যেমন অনেক সম্পত্তি অপরদিকে ব্যবসা, বাড়িতে সুরম্য অকট্রালিকা। বাজাওে একচেটিয়া কারবার করেন। গ্রামের সব শ্রেণলি মানুষের কাছে তিনি প্রিয় এবং বিশ্বস্ত। কৃষকরা ফসলাদি বিক্র কওে, গরু-ছাগলের কেনা-বেচার টাকাসহ মসজিদ-মন্দিরের চাঁদা পর্যন্ত তাঁর কাছে জমা রাখে। ধর্মীয় নেতারাও এদেও দ্বারা প্রভাবিত হয়, ফলে দরিদ্র জনগোষ্ঠি যাাঁদের উপর ধর্মীয় নেতাদের কর্তৃত্ব রয়েছে তারা হয় শোষিত। ও ই ধনী লোকটি তার কাছে জমাকৃত বা গচ্ছিত টাকা দিয়ে সারাদবছর ব্রবসা করো লাভবান হন। জমাকারীদেও ঈস্খয়োজনের সময় তিনি বিশ্বত্বতার সাথেই আমানত ফেরত দেন। অভাবগ্রস্ত কৃষকরা তার কাছ থেকে বাকিতে খাদ্য শস্য ক্রয় কওে বা ধার-দেনা করে, পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে ভিটামাটিসহ শেষ সম্বলটুকুও লিখে দিতে বাধ্য হয়। ধনী লোকটি কোন কিছুই জোর করে নেয় না। এভাব্ েওই ধণী লোকটি প্রচতুর সম্পদের মালিক হয়েছেন।
থানা-পুলিশের অত্যাচারে এলাকার লোক অতিষ্ট। যখন যে কাউকে গ্রেফতার করে মোটা অংকের ঘুষ খায়। কোথাও কোন অপরাধ সংঘটিত হলে প্রকৃত অপরাধীরা থানা-পুলিশের সাথে যোগসাজশে ঘুরে বেড়ায়, নিরীহ লোক হয় হয়রানীর শিকার মদ-গাঁজাসহ সকল প্রকার অসামাজিতক কার্যকলাপের সাথে জড়িতদের থেকে প্রশাসনের লোকজন নিয়মিত মাশোহারা আদায় করে থাকে। টাকার বিনিময়ে সত্যকে মিথ্যা, মিথ্যাকে সত্যে পরিণত করার ইতিহাসও পুলিশের আছে ব্যক্তিগত শত্রতার কারণে অনেকেই পুলিশের সাহায্য নিয়ে প্রতিপক্ষকে হয়রানী করে থাকে। এছাড়া থানায় অন্যান্য প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের কাছে কাজেতর জন্য গেলেও ঘুষ দিতে হয়। এক কর্মকর্তাার বিরুদোধ অপর কর্মকর্তার কাছে অভিযোাগ কওে কোন প্রতিকার পাওয়া যায় না। অফিসের পিয়নকেও বখশিস না দিলে বসতে দেয়াতো দুরের কথা ভালো ব্যবহারও করে না। ঘুষ যেন তাদের কাছে আজ আর ঘুষ নয় ন্যায্য পাওনা। কর্মকর্তা-কর্মচারীদেও আচরণ দেখলে মনে হবে তারা সবাই যেন মনিব। যেন ভুত্যেও সাথে প্রভুর আচরণ। জনসাধারণ তাদের কাছে আজ্ঞাবহ। তারা গর্ব করে বলে থাকে াামরা সরকারি চাকুওে, জনগণের খাদেম নই। অফিসে আসা-যাওয়া করলেই যখন বেতন পাওায়া যায় তখন জনগণের কাজ না করলেইবা কি আসে যায়। জনপ্রতিনিধিরাই সব সময় এদেও খেদমত করতে ব্যস্ত। কোর্ট-কাচারীতে টাউট আর বাটপারদের ভীড়, প্রতিনিয়তই তারা জনসাধারণকে ঠকাচ্ছে। আখ ক্রয় কেন্দ্রে ওজনে বেশী নিয়ে ক্রয় কর্মকর্তারা কৃষকদেও টকায়, পাট ক্রয় কেন্দ্রেও একই অবস্থা। সেখানে ওজনে বেশি নেয়া ছাড়া পাটের কোয়ালিটি হেরফের করে বিক্রেতাকে প্রতারিত করা হয়।
তাছাড়া নিত্তি প্রতি কর্মকর্তার জন্য কয়েক কেজি ‘উপরি দিতে হয়। এটা যেন রেওযাজে পরিণত হয়েছে। র্কষকরা কোন প্রতিবাদ করতে সাহস পায় না। যারা প্রতিবাদ করবে তারা অসাধু কর্মকর্তাদের সাথে ব›ধুত্ব রেখে কিছু আয় করে।প্রতিবাদ করলেইবা র্কখশদেও কথা কে শোনে? মোট কতা গ্রামের সরল প্রাণ কৃষকরা বিভিন্নভাবে সর্বত্রই প্রতারিত হচ্ছে। তাদের যেন কোনই অধিকার নেই। শধু শোষিত হওয়ার জন্যই তাদের জন্ম। গ্রামের এই সব মেহনতি মানুষকে শাসন করবার জন্যই যেন প্রশাসন। শোষণ করার জন্যই যেন মহাজন। গ্রামের অচেতন জনসাধারণ এভাবেই বহমুখী শোষণের শিকার হচ্ছে। আশা-আকক্সক্ষা বলতে তাদের কিছই নেই। তারা জীবনের সাথে কঠিন সংগ্রাম করে বেঁচে আছে। খরা, দুর্ভিক্ষ আর বন্যাসহ সকর প্রকার প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রধান শিকার এই মেহনতি কৃষককূল। এরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।এই এলাকার নারী সমাজের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। তারা পরনের বস্ত্র আর মাথার তেল পর্যন্ত পায় না, পেট পুরে খাওয়াও হয় না অনেকের । অনেক মহিলা যৌতুকের দাবি মেটাতে না পেরে তালাকপ্রাপ্তা হয়ে বাপা-ভাইয়ের ঘাড়ে বোঝা হয়ে আছে। গর্ভ ও প্রসূতি অবস্থায় পুষ্টিকর খাবারও ভাগ্যে জোটে না। অনেকেই কঠিন স্ত্রী রোগে রোগাক্রান্ত, জর্ণি-শীর্ণ চেহারা। ডাক্তার দেখানো তাদের সৌভাগ্যের ব্যাপার। সার্বিক দিক দিয়ে এই অঞ্চলের লোক চরম আর্থিক সংকটে নিপতিত। স্বাদ-আহলাদ, আনন্দ-ফূর্তি বাদ দিয়ে তারা কঠিন শ্রমের মাধ্যমে বেঁচে আছে কালের সাক্ষী হয়ে।
গ্রামের শিক্ষিত, ধনী, মধ্যবিত্ত ও টাউট শ্রেনীর সকলেই কোন না কোন রাজনৈতিক দলের সাথে জড়িত। তারা এই বিভিন্ন দলে বিভক্তির কারণে পরস্পর ঝগড়া বিবাদ, মারামারি থেকে শুরু করে খুন-খারাবি পর্য়ন্ত করে থাকে। এসবের কারণে অনেকে মামলা মোকদ্দমায় জড়িয়ে জেল-হাজত খাটছে। কেউ কেউ জমি-জমা বিক্রি করে সর্বশান্ত হয়ে গেছে। এই গ্রামটির চিত্র থেকে সহজ্ইে অনুধাবন করা যায় বিশ্বের গ্রাম বাংলার অন্যান্য মেহনতি মানুষ কেমন আছেন।

Comments (0)
Add Comment