কৃষি পণ্যের সাথে শিল্প পণ্যেও বিনিময় বৈষম্যেও কারণে শিল্প প্রধান দেশ ধনী থেকে আরও ধনী হচ্ছে। কৃষি প্রধান দেশ দরিদ্র থেকে আরও দরিদ্র হচ্ছে। অর্থের অঢেল পাহাড় গড়ছে শিল্প ও কারিগরি শিল্পে উন্নত বিশ্ব। উৎপাদনে জড়িত না থেকেও শুধু মুলধনের কারণে পুঁজি জমা হচ্ছে একটা গোষ্ঠী বা শ্রেনীর হাতে। আর এই অর্থ জীবনোপকরণের জন্যে ব্যয় হচ্ছে খুবই সামান্য, অবশিষ্ট অর্থ হচ্ছে শোষনের বড় হাতিয়ার। একদিকে অর্থের সুদ অন্যদিকে উচ্চ-মুনাফা।অর্থ বাজারে চালু না রেখে সংকট সৃষ্টি করাও সাধারণ মানুষের অভাবগ্রস্ত হওয়ার অন্যতম কারণ। ভুমিহীন কৃষক, সাধারণ মানুষ, শিল্প উৎপাদনে সাধারণ শ্রমিক এরা সবাই কুলুর বলদের মত চোখ বাঁধা অবস্থায় শুধু বোঝাই বয়ে যাচ্ছে, ফল ভোগ করছে অন্যরা। তারা যেন দিবা-রাত্রি একই চক্রে প্রদক্ষিণ করছে। এভাবেই বিশ্বের কৃষক, শ্রমিকসহ মেহনতি মানুষ দিন দিন নিঃস হয়ে যাচ্ছে। স্বপক্ষে যারা কথা বলছে, তারাও ক্ষমতালোভী শোষক শ্রেনীরই দোসর। মেহনতি মানুষকে পুঁজি করে এ হলো তাদের আন্দোলন করে ক্ষমতায় যাওয়ার কূট-কৌশল। প্রকৃত পক্ষে দেশ ও জাতির উন্নয়নের জন্য তারা মোটেও আন্তরিক নয়। যুগ যুগ ধরে এ কথারই পরিচয় মেলে ইতিহাসে।
গণতন্ত্রের নামে অর্থনৈতিক শোষণ, সমাজতন্ত্রের নামে মানুষের অধিকার হরণ, ধর্মেও নামে মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি, সবই বুর্জোয়া শ্রেণীর ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্যে রাজনীতির নামে প্রতারণা। অর্থ নামক শোষণের হাতিয়ারটির সাহায্যে তারা কৌশলে শোষণ করেছে। সমাজের সংখ্যা গরিষ্ঠরা দরিদ্র হওয়া সত্ত্বেও তাদের হাতে ক্ষমতা নেই। সমাজ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত নীতি-নির্ধারণের সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের অংশগ্রহণ নেই। তাই অভাবগ্রস্ত মানুষের ভাগ্যের কোন ইতিবাচক পরিবর্তন হ”্ছে না। তারা সংঘবদ্ধ নয়। ঐক্যই শক্তি আর অনৈক্যের অর্থই দুর্বলতা। এই সত্যটি প্রতিভাত হচ্চে তাদেও জীবনের সর্বক্ষেত্রে। অর্থনৈতিক দৈন্যতা তাদের নৈতিক চরিত্রকে করছে অবক্ষয় । বিপ্লবী চিন্তার পরিবর্তে তারা হতাশায় হচ্ছে নিমজ্জিতত। সমাজের এই বৃহৎ জনশক্তি দিন দিন হয়ে যাচ্ছে কর্ম-অক্ষম। তাদেও সৃজনশীল কোন চিন্তা-চেতনার অবকারশ নেই। জতিীয় ঐক্য ও উন্নয়ন সম্পর্কে তারা অজ্ঞ। এই বৃহৎ জনসম্পদ কাজে লাগিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উন্নয়নের কোন চিন্তাও করছেন না জাতীয় গবেষকরা। আত্মকেন্দ্রিক চিন্তা-ভাবনা জাতীয় ও সভ্যতার বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে। এ ধরনের চিন্তা-ভাবনা পুঁজিবাদী বিশ্বের অর্থনীতিই তাদের শিখিয়েছে। অর্থ আয় আর জমাবার স্বাধীনতা গনতন্ত্র নামের নরপিশাচতটিই স্বীকৃতি দিয়েছে। জনকল্যাণের নামে গণতন্ত্রের লেবাসধারীরা কোটি কোটি ডলারের মারণাস্ত্র তৈরি করে বিশ্ব বাজারে নিজেদের একচেটিয়া প্রাধান্য টিকিয়ে রাখতে অবহেলিত দরিদ্র জাতিকে ভীতি প্রদর্শন করছে।
দরিদ্র বিশ্বের যুব-সমাজকে তারা সুকৌশলে ধ্বংস করছে। দরিদ্র জনগোষ্ঠি যাতে একত্রিত হয়ে জাতীয় স্বনির্ভরতা অর্জনে অংশগ্রহণ করতে না পারে, এজন্য তারা সৃষ্টি করে রেখেছে বহু রাজনৈতিক দল। বিভিন্ন দল সৃষ্টির কারণে মানুষ পরষ্পর অন্তকলহে নিমজ্জিত। মিত্র দ্বন্দ্বের পরিবর্তে বেরি দ্বন্দ্বের কারণে তার একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত, আর এই বৈরিতার কারণেই সমাজের সকল প্রকার সস্ত্রাসী কার্যকলাপের উৎপত্তি হয়ে থাকে।
ধর্মীয় অনুশাসন নয়, নয় সমাজতন্ত্রের সম-বন্টন ব্যবস্থা, গণতন্ত্রেও নামে তার সৃষ্টি করেছেথ কৌশলগত অর্থনৈতিক শোষণের নতুন অস্ত্র। আর এই অস্ত্র দিয়েই রক্ত চোষার মত চুষে নিচ্ছে দরিদ্র মানুষের রক্ত। কৃষক-শ্রমিক আর সাধারন মানুষের কোন অবকাশ নেই, জাতীয় উন্নয়ন আর স্বনির্ভরতা অর্জনের চিন্তা করায়। মৌলিক প্রয়োজন মেটাতেই তাদের হিম শিম খেতে হয় প্রতিনিয়ত। সারা দিন কঠিন শ্রমের পর রাতে একটু বিশ্রাম। অভাব- অনটনের মধ্যে বিলাসিতা আর বিনোদনের কোন সুযোগ তারা পায় না। কষ্টের উপার্জিত সম্পদের ন্যায্য মূল্য থেকেও তারা বঞ্চিত। অপরদিকে মুষ্টিমেয় কিছু সম্প্রদায় ভোগ-বিলাস নিয়ে মেতে থাকে সারাক্ষণ। মেহনতি মানুসের উৎপাদিত ফসলের সমুদয় মুনাফা ভোগ করে এই মুনাফাখোররা। সরকারিভাবেও এদেও মদদ দেয়া হয়। দেশের শিল্প-কারখানা, ব্যাংক-বীমাসহ সকল ব্যবসা-বাণিজ্য এদের হাতে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ রয়েছে এদের কাছে। এক জরিপে দেখা গেছে বিশ্বের ৯৫ ভাগ সম্পদ ৫ ভাগ মানুষের হাতে আর ৫ ভাগ সম্পদ ৯৫ ভাগ মানুষের হাতে। এই পাহাড় সমান বৈষম্য যেখানে বিরাজমান, সেখানে কি করে শান্তি প্রতিষ্ঠা হতে পারে-সেটাই আজ মানব জিিতর কাছে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছো । যাদের ভাত-কাপড় আর বাসস্থানের নিশ্চয়তা নেই, তাদের শিক্ষা, চিকিৎসা আর বিনোদন তো পরের কথা। দেশ-দরদী রাজনীতিবিদরা সাধারণ এই দুঃখ-দুর্দশা নিয়ে কতটুকু ভাবছেন, তা তারাই জানেন। সুদ-ঘুষ আর দুনীতির্তে ছেয়ে-যাওয়া এই সমাজ আজ অন্ধকারে নিমজ্জিত, কেউ যেন তাকে আর ঠেলে তোলার সাহসী ভুমিকা নিতে রাজি নয়। যার সৎ-সাহস আছে, তার উচিৎ জনমতের পরোয়া না করে এবং সব রকম বিরোধিতার মোকাবেলা করে আপন কর্তব্য সম্পাদন করা। বিশ্বের পরাধীন জাতিগুলোর পরাধীনতার নাগপাশ থেকে মুক্তি পেতে ঝড়ছে কত রক্ত। কত মা-বোন দিয়েছে ইজ্জত! আর তার বিনিময়ে অর্জিত সে স্বাধীনতা কি দিতে পেরেছে সাধারণ মানুষের মুক্তি? আর তাই যদি হবে তবে বিশ্বব্যাপি আজ ক্ষুধার্ত মানুষ কেন? কেন আজ স্বাধীনতার পতাকা তলে ভুখা মানুষের মিছিল? কেন রাজধানী শহরগুলোর ফাঁক-কোকরে উলঙ্গ শিশু দুধের জন্য চিৎকার করছো? কেন রাতের অন্ধকারে যুবতীরা রাস্তায় রাস্তায় ইজ্জত বিক্রি করছে? নিশীথ রাতে কেন যুবতীর বুক ভরা ব্যথার প্রতিধ্বনি শোনা যায়।
দুর্ভিক্ষ পীড়িত সোমালিয়ায় কেন ক্ষুধার্ত শিশুর হাহাকার! এরই নাম কি স্বাধীনতা! অশীতিপর বৃদ্ধরা যখন ঠেলা-গাড়ি বয়ে বেড়ায় তখন অট্রলিকার বেলকোনিতে বসে সেই করুণ চিত্র দেখতে মানবতার লজ্জাবোধ হয় না? বৃদ্ধের ঠেলা-গাড়ি টানা, রাস্তার পাশে শিশুদের ইট ভাঙা-অর্ধ উলঙ্গ যুবতী ও বৃদ্ধা রমনীর মাটির ঝুড়ি মাথায় কওে কঠিন শ্রম দেয়া, এসব চিত্র কি কখনও আমাদের হৃদয়কে স্পর্শ করেছেন? আমরা কি কখনও ভেবে দেখেছি কে ওদেও মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য করছে?