ভ্রমণ বৃত্তান্ত

একবার এক ব›ধুর সাথে গিয়েছিলাম মন্ত্রণালয়ে। সে একটা কাজ নিয়ে ঘুরছে প্রায় দেড়-দু’বছর, তবুও কাজ হচ্ছে না। ঐদিন অনেক চেষ্টা করলেন অফিসারের সাথে দেখা করার জন্যে। একজন সহকারি সচিব, যিনি একজন মহিলা, অতি সুন্দও চেহারা, ববকাট চুল, মুখে যা মেকাপ। দরজায় প্রবেশ নিষেধ লেখা থাকা সত্ত্বেও বন্ধুটি ভিতরে ঢুকে সালাম দিলেন। মহিলা উগ্র মেজাজে বললেন, আপনি কি চান? বন্ধুটি বলল, আপা আমার একটা ফাইল আছে। মহিলা বললেন, তা আমি কি করব? যদি একটু দেখতেন, চার-পাঁচ মাস আপনার কাছে এসেছে। আমি দেখব, যান আর আসবেন না। একজন জলজ্যান্ত শিক্ষিত মানুষের সাথে ভদ্র মহিলার এহেন অচরণ, আমার দৃষ্টিকটু এবং অশালীন মনে হলো। রুম থেকে বেরিয়ে বন্ধুকে বললাম, মহিলা তোমার সাথে এমন অচরণ করল, তুমি তার  বসকে বলো না কেন? বন্ধুটি বলল, বলে কোন লাভ নেই, এই মহিলাই সব। সে যা  বলে, বসরা তাই শোনে। আরও বললো তার বস বিয়ে করেছে নিজের আপন মামীকে। এই হলো মহিলার বসদের অবস্থা! অন্যদিকে বসদের সাথে মহিলার সম্পর্ক খুবই ভালো। কৌতুহলী হয়ে আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘তার স্বামী নেই?’ বন্ধু বলল, স্বামী একজন সহকারি জর্জ, তবে তার সাথে সম্পর্ক ভালো নেই। কারণ তার স্বামীও পরকীয়ায় আসক্ত। যা-হোক হাঁটতে হাঁটতে মহিলার বসদের সাথে দেখা করার জন্যে বন্ধুটি চেষ্টা করলেন, কিন্তু পারলেন না। দুইদিকে লোহার  কলাপসিবল গেট, এই অংশটুকুর মধ্যে ঢোকার জন্য আলাদা পাস লাগে। এখানেই মহিলার দুইজন বস বসেন। এখানে ১০ টাকা দিয়ে আর ঢুকা গেল না। যেমনিভাবে দুইজতনে বিশ টাকা দিয়ে ঢুকা হয়েছিল সচিবালয়ের ভিতরে। কয়েকদিন পর বন্ধুটিকে জিজ্ঞাসা করলাম তার কাজের খবর, বললো অফিসারদের সাথে দেখা করার ভাগ্য না জোটার কারণে সময় উত্তীর্ণ হয়ে গেছে, কিন্তু কাজ হয়নি। একদিন একজন অফিসার থাকেন তো অন্যজন থাকেন না। স্লিপ দিয়ে ঘন্টারদ পর ঘন্টা অপেক্ষা করেও ডাক পড়ে না। ব্যর্থ হয়ে ফিরতে হয় অনেক সময়। অভিযোগ দায়ের করার মত জায়গা নেই।
অন্য একদিনের কথা। একজন অফিসারের কাছে গেলাম, একটা প্রতিষ্ঠানের কাজের জন্য। প্রথমে ভদ্রলোক অফিসারসুলভ ব্যবহারই করলেন, অর্থাৎ কী চান? ঠিক আছে আমি দেখব, যান। মানব সুলভ কথা যেমন- বলেন, আপনাকে কী সাহায্য করতে পারি ইত্যাদি, আন্তরিকতাপূর্ণ কথা। কয়েকদিন পর আবার গেলাম, স্যার আমার ফাইলটা। বার বার এস আমাকে বিরক্ত করবেন না, আমার সময়মত দেখব। এভাবে প্রায় তিন-চার মাস চলে গেল। অনেকে পরের ফাইল আগে চলে যায়, অথচ আমার ফাইলটা টেবিলেই পড়ে থাকে। বিরক্ত হয়ে একদিন বললাম, স্যার অনেক দেরিতে আসা ফাইলগুলো আগে চলে যায় আর আমার ফাইলটা এখনও গেল না? উত্তেজিত হয়ে অফিসার সাহেব বললেন, আমাকে কি আপনার কাছে জবাব দিতে হবে? আপনি যান আর আসবেন না। এভাবে সাত-আট মাস চলে গেল। ভীষণ খারাপ লাগতে লাগল। একদিন নিরপিায় হয়ে ভালমন্দ কিছু বলার জন্যে প্রস্তুত হয়ে গেলাম।
লক্ষ্য করে দেখলাম, এক ভদ্রলোক তার সাথে বেশ হাঁসি-তামাশা করছে। আমি রাগ না করে ফিরে এলাম। পরের দিন এ অফিসারের পিএ-কে জিজ্ঞাসা করলাম, ভাই আমার কাজটা হওয়ার উপায় কী? তিনি বললেন, আপনি কি সৌদি আরব থেকে এলেন? ঊললাম কেন ভাই? আরে সাহেব মসল্লা ছাড়েন কাজ হয়ে যাবে। এতদিন ঘুরে কত টাকা রিক্সা ভাড়া দিয়েছেন হিসেব আছে? আর কতদিন দিতে হবে তার কথা ভেবেছেন? কথা শুনে আমার বোধেদয় হল, মসল্লা ছাড়লাম, আমার কাজ হলো। অফিসার সাহেব এর পরে কাজ শেষ হওয়া অবধি সামনের চেয়ারে বসাতেন। চা-সিগারেট দিয়ে আপ্যায়ন করতেন। কোন দিন আর খারাপ ব্যবহারও করেননি। এসবই হলো মসল্লা দেয়া আর না দেয়ার কারণে। আজকাল মসল্লা ছাড়া কোন কাজ হচ্ছে বলে আমার জানা নেই। বস, না হয় জুনিয়ার, না হয় কেরানি, না হয় পিয়ন কোথঠর না কোথাও মসল্লা বের কতে হবেই। এতে কোন সন্দেহ নেই। লেবাস আর বয়সের কোন বাধা-বিঘœ নেই, দাড়ি, টুপি, পাকা লম্বা কোর্তা, ধুতি, টিকি, ক্রদস কোন কিছুর বাছ-বিচার নেই। সর্বত্রই মসল্লারদ দরকার।

Comments (0)
Add Comment