রাজনৈতিক প্রতারণা
দেশের কিশোর ও যুব সমাজ, যারা বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করছে, এই অপরাজেয় যুবশক্তি যাতে কোন দিন একত্রিত হতে না পারে, সে জন্য রাজনৈতিক দলগুলো অংগ সংগঠন নাম দিয়ে তাদের হাতে তুলে দিচ্ছে অস্ত্র। তাদের এক ভাই গুলি চালাচ্ছে অপর ভাইয়ের বুকে। অনেক তাজা প্রাণ ঝরে যাচ্ছে অকালে ক্ষমতা লোভি ওই সব পেশাজীবী রাজনৈতিক নেতারা থাকছে নিরাপদে। তাদের ছেলেমেয়েরাও পড়ালেখা করছে বিদেশে। ছাত্র সমাজকে উস্কে দিয়ে বক্তৃতা-বিবৃতি নিয়েই ব্যস্ত থাকে সরাক্ষণ। ক্ষমতা চাই, ক্ষমতা! হায়েনার মত ছুটছে ক্ষমতার পেছনে। খুন-জখম কোথায় কি হলে, তা নিয়ে তাদের মাথা ব্যথা নেই বরং কর্মী মারা গেলে তার লাশ নিয়ে মিছিল-মিটিং করে আন্দোলন চাঙ্গা করা যাবে -এটাই তাদের পরিকল্পনা। কতদিন আর চলবে লাশের রাজনীতি কে জানে!
সাধারণ মানুষের স্বপক্ষে তারা যা কিছু বলেন তা সবই ভাঁওতা এবং রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারের কুটকৌশল। জনসমর্থন নেবার জন্যে এসব কল্যাণমুখী বক্তৃতা ছাড়া কি পুঁজিই আছে তাদের? দরিদ্র মানুষের অধিকাংশই নিরক্ষর, এই অজ্ঞ জনগোষ্ঠিকে ধোঁকা দেয়া খুবই সহজ। কারণ এই বিপুল জনগোষ্ঠি মোটেও সচেতন নয়। ভেড়ার পালের মত তাদের যেদিক-সেদিক নেয়া যায়। চাতুর্যপূর্ণ বক্তৃতায় তারা সহজেই উদ্বুদ্ধ হয়, তাদের হৃদয়ে হয় আশার সঞ্চার। এই সরলতার কারনেই তারা ঠকে বারবার। পুঁজিবাদি বিশ্বের ধারক-বাহকদের সৃষ্টি করা প্রচলিত বাহ্যিক গণতন্ত্র কোন কল্যাণই বয়ে আনতে পারেনি আজ অবধি। যুগ যুগ ধরে গণতন্ত্রের প্রবক্তারা ছিনি মিনি খেলছে সংখ্যা গরিষ্ঠ মেহনতি মানুষের ভাগ্য নিয়ে।
রাতের অন্ধকারে দুঃখিনী মায়ের হাহাকার! পুষ্টিহীন শিশুর ক্ষুধার জ্বালায় চিৎকার, হোস্টেলে না খেয়ে শুয়ে থাকা ছাত্র-ছাত্রীর করুণ অবস্থা নিয়ে আমরা কি একবারও চিন্তা করি? আমরা তো সবাই জানি পেট এমন এক বস্তু যে, ধর্ম থাক আর নাই থাক, সৃষ্টিকর্তাকে পাওয়া যাক আর নাই যাক তা পুরাতেই হবে। যে সন্তানটিকে দরিদ্র পিতা-মাতা উচ্চশিক্ষা নিতে পাঠিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে সে যখন রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে লাশ হয়ে ফিরে যায় তাদের কাছে, তখন সেই সন্তানহারা পিত-িমাতার করুণ আর্তনাদ দেখলে হয়তো বিজ্ঞ রাজনীতিবিদ বন্ধুরা শুধুমাত্র রাজনৈতিক স্বার্থের কারণে এসব সরল প্রাণ সন্তানদের ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতেন না। ভন্ড ঐ রাজনীতিবিদরা ক্ষমতায় গেলে ওই ছাত্ররা যে একটা চাকরির জন্য ধন্যা দিয়েও চাকরি পাবে না, সে কথাটি
ছাত্রভায়েরা কখনও ভেবে দেখছ না। এক অজ্ঞাত মোহে বেকারত্বেও ঝুঁকি নিয়েও তারা তথাকথিত নেতাদেও আদেশ-নিষেধ পালন করে চলেছে।
পড়ালেখা শিখে জাতীয় উন্নতির চেয়ে তারা জাতির কাছে দাঁড়াচ্ছে বোঝা হয়ে। বেকারত্বেও অভিশাপ তাদেও পিছু ধাওয়া করছে প্রতিনিয়ত। উন্নত বিশ্বের মত তাদের কর্মজীবনের কোনও নিশ্চয়তা নেই, কারণ তারা দরিদ্র জাতির সন্তান, তারা জন্মেছেই ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে।
জনকল্যাণের জন্য যদি রাজনীতি হয় তবে এত দল, ভিন্ন ভিন্ন আদর্শ, এসব নিয়ে পারস্পারিক দ্বন্দ্ব কলহ কেন? জনগণকে সবদলই তো বলে তাদের মতাদর্শই উত্তম। অজ্ঞ জনসাধারণ দলের নামেই সমর্থন দেয় অপরের দেখাদেখি। আদর্শ নিয়ে বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা তাদের নেই।
বহুদলের কারণে জনগণ বহুধা বিভক্ত হয়ে জাতীয় ঐক্যকে করছে বিনষ্ট, ফলে দিন দিন তারা পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে। এভাবেই ঝিমিয়ে পড়ছে বিশ্বের দরিদ্র জাতি। অপরদিকে শোষেেকরা বাধা বিঘœহীনভাবে তাদের শোষণ করছে। লংকা যখন পুড়ে, রাম তখন বাঁশি বাজায় এ যেন সে প্রবাদেরই মূর্ত প্রতীক।
ভারত উপমহাদেশ শাসন করার সময় স্যার জন ম্যালকম বলেছিলেন, “এই বিশাল সাম্রাজ্য (ভারতে) আমাদের অনন্য সাধারণ শাসন কর্তৃত্বের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একমাত্র উপায় হলো আমাদের শাসনাধীন ভারতে যতগুলো বড় দল রয়েছে, সেগুলো ভেঙ্গে ছোট ছোট দলে বিভক্ত করা, আবার প্রতেকটি উপদলকে বিভিন্ন জাতি, সম্প্রদায় ও গোত্রে দ্বিধা বিভক্ত করে তোলা, যতদিন তারা এমনিভাবে দ্বিধা-বিভক্ত হয়ে থাকবে খুব সম্ভবত ততদিন কোন বিদ্রোহ আমাদের ক্ষমতাকে নড়বড়ে করতে পারবে না।’’ আজ যেন দরিদ্র বিশ্বের প্রতিটি দেশে স্যার জন ম্যালকমের সেই উক্তিরই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। জাতীয় চেতনা বিনষ্টের জন্য এবং পুঁজিবাদি বিশ্ব অর্থনৈতিক শোষণের জন্য এই ফর্মূলাটিই অনুসরণ করছে।
দরিদ্র বিশ্বের অধিকাংশ দেশই আজ উপনিবেশ থেকে মুক্ত জনসাধারণের বন্ধুরা কতবারই ক্ষমতায় এলেন কিন্তু পরিবর্তন তো কিছুই হল না। কাজকর্ম ফেলে, শ্রম নষ্ট করে ভোট দিতে যায় তাদের ভাগ্য বিধাতা, প্রতিনিধি নির্বাচনের জন্যে বুক ভরা আশা, বিপদ-আপদে তারা ছুটে জনপ্রতিনিধির কাছে। হতাশ হয়ে ফিরে আসে। আজ আর সেই প্রতিনিধি আপনজনের মত কাছে ডেকে বসায় না, শোনে না তার সমস্যার কথা, আজ তার সাক্ষাৎ পাওয়াই দুরূহ। যেমনটি পাওয়া যেত নির্বাচনের আগে। জনগণের কাছ থেকে তার যা নেবার ছিল তা নেয়া হয়ে গেছে। এখন ফ্লাগ টানায়ে মেহনতী মানুষের বুকের উপর দিয়ে গাড়ি চালায়ে গেলেই কি আসে যায়! প্রশাসনের আমলারা তো তাদের স্যালুট দিতেই ব্যস্ত। অপকর্ম ঢাকার জন্য, গুণ-কীর্তন করার জন্য হলদে সাংবাদিক বন্ধুরা তো কলম নিয়ে বসেই আছেন। শুধু কিছু অনুগ্রহ পেলেই হলো।