সমাজতন্ত্র বনাম গণতন্ত্র

0 3,157

এবার দেখা যাক, মঙ্গলময়ের দল বলে দাবিদার সমাজতন্ত্রীরা মানব কল্যাণে কতটুকু অবদান রেখেছে, আর আজ তার ফল কি দাঁড়িয়েছে।
যে সমাজতন্ত্রীরা এতদিন পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে শুধুমাত্র প্রয়োগের মাধ্যমে বাহ্যিকভাবে সঠিক বলে মনে করে নিজেদেরকে বৈজ্ঞানিক তত্ত্বেও দাবিদার বলে আখ্যায়িত করেছেন, আজ তারাই সুর পাল্টে বলছেন ‘তত্ত্ব সঠিক ছিল ভুল হয়েছে’।
শ্রেণীহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মানবিক জীবনের সব রকম সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার কথা বললেও বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটেনি মোটেও। সমাজতন্ত্রকে তারা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা বলে আখ্যায়িত করে। তারা বলেছে, পৃথিবীর অধিকাংশ দেশই তৃতীয় বিশ্বেও অন্তর্ভুক্ত দরিদ্র দেশ ও সেখানকার অধিকাংশ জনগোষ্ঠী যেহেতু মানবেতর জীবন-যাপন করতে বাধ্য হয় এবং তাদের এই জীবনযাপনের জন্য পৃথিবীর ধনী বুর্জোয় দেশগুলো মূলত দায়ী। অপরদিকে সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে যেহেতু গণতন্ত্র নেই, অথবা এখানে মানবিক কল্যণমূলক ব্যবস্থা প্রবর্তন হওয়া সম্ভব নয় এ দাবি গণতন্ত্রীদের।
সমাজতান্ত্রিক পূর্ব ইউরোপীয় ও সোভিয়েত দেশগুলোর ভয়াবহ চিত্র থেকে এটাই প্রমাণিত হয়েছে যে, একটা দেশের সামরিক সাফল্যই সে দেশের একমাত্র সাফল্যের চিত্র নয়। তাই আজ বৃহৎ সমাজতান্ত্রিক বা সোভিয়েত ইউয়িনসহ পৃথিবীর এক তৃতীয়াংশ, যা এতদিন সমাজতন্ত্রেও অন্তর্ভুক্ত ছিল তা গণতন্ত্রের হাওয়ায় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেছে। সমাজতান্ত্রিক দেশের বর্ষিয়ান নেতারা ্এতদিন ভেবে দেখেননি যে, মানুষের মৌলিক দাবি কোন সরকার পূরণ করতে পাওে না, যতক্ষণ না সেখানে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়।
সমাজতন্ত্রেও কমান্ড অর্থনীতিতে রাষ্ট্র ঠিক করে দেয়, উৎপাদিত দ্রব্যেও পরিমাণ, উৎপাদন ব্যয়, পণ্যের গুণগত মান এবং শ্রমের পরিমাণ। এখানে শ্রমিকদের কোনও ভূমিকা নেই। উপরোক্ত শর্তেও ভিত্তিতে দ্রব্য নির্মিত হলেও দ্রব্যের বিক্রি নিশ্চিত হবে এটাও ধওে নেয় যায় না। এই ব্যবস্থায় উৎপাদিত পণ্য স্থূপাকারে জমা থাকলেও উৎপাদন বন্ধ থাকে না। সেখানে উৎপাদনে মুনাফার প্রশ্ন নেই, আছে মানুষের কাজ যোগানোর প্রশ্ন। কারণ কাজ দেয়া সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারের দায়িত্ব। শ্রমিকের কাজ দেয়া যেখানে বড় কথা সেখানে অতি উৎপাদনের কারণে কারখানা বন্ধ করার প্রশ্নই নেই।
অতি উৎপাদনের কারণে উৎপাদিত মালামাল বাজারে বিক্রি না হলেও ঢালওভাবে লোকসানের মাধ্যমে কারখাণা চালু রাখা হয়। অথচ সমাজতন্ত্রের জন্মদাতা ও প্রবক্তা মার্কস ও লেলিন এক সময়ে পুঁজি ব্যবস্থাকে অতি উৎপাদনের অভিযোগ অভিহিত করেছিলেন। বেকারত্ব ঘুচানোর অজুহাতে শ্রমিকদের কাজ দেয়া হয় বলে এবং কাজ না থাকলে শ্রমিকের বেতনের নিশ্চয়তা থাকার কারণে কাজের প্রতি তাদের আগ্রহ থাকে না। কারখানা চালু রাখার কারণে একদিকে যেমন অতি উৎপাদনের ফলে ঢালাওভাবে লোকসান হয় অপরদিকে জনগণকে প্রয়োজনীয় জিনিসের জন্য দোকানের সামনে ঘন্টার পর ঘন্টা লাইন দিয়ে দাঁড়িয়েও থাকতে দেখা যায়।
সমাজতন্ত্রের কর্ণধাররা সর্বদাই নিজেদেরকে সব বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ভেবে সাধারণ মানুষকে নীতি নির্ধারণের বাইরে রাখেন। আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার না থাকার কারণে সাধারণ শ্রমজীবি মানুষ তাদের অসুবিধা বা অভিযোগ কাউকে বলতে পারে না। সর্বদাই তাদের হুকুম পালন করে যেতেই হয়। তা না হলে শ্রেণী-শত্র“ আখ্যা দিয়ে তাকে এবং তার পরিবার-পরিজনসহ নির্মূল করা হয়। সমাজতন্ত্রীরা যিিদও মনে করেন যে, সবচেয়ে আদর্শ রাষ্ট্র ব্যবস্থা রাষ্ট্রের কর্ণধাররা আগেই স্থির করে দেন। অতএব অন্যদের কিছু বলার থাকতে পারে না। কাজেই অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যেই নিহিত থাকে অমানবিকতার মূলবীজ । যেটাকে সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যবস্থা ভাবা হয়, কার্যত দেখা যায় সেটাই সবচেয়ে নিকৃষ্ট। মার্কসবাদের মূলকথা হলো শ্রেণী-সংগ্রাম, আর সে শ্রেণী-সংগ্রামের মূল হাতিয়ার হলো অস্ত্র। কেননা মার্কসবাদীরা গায়ের জোরেই ক্ষমতা দখলের পথ বাতলে থাকেন। তাদের কাছে বন্ধুকের নলই ক্ষমতার একমাত্র উৎস এবং দেশে দেশে সেভাবেই তারা রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে ছিলেন। অথচ ইতিহাস পাঠ করলে জানা যায়, যে কোন সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় চিরদিন জনগনই ক্ষমতার উৎস। রাষ্ট্র ব্যবস্থার পরিবর্তন জনগণ করে থাকেন। জনগণকে বাদ দিয়ে যে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কার্যক্রম তা শুধু অগণতান্ত্রিক হওয়ার কারণেই অমানবিক। মানুষের জন্য যা কিছু মঙ্গলজনক তা মানুষই স্থির করে থাকে। মানুষকে বাদ দিয়ে কোন কিছুই মানবিক নয়। ইদানিং কালে সমাজতন্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে জনগণ রাষ্ট্র-ব্যবস্থা উৎখাত করেছে স্বতৎস্ফূর্ত আন্দোলনের মাধ্যমে অস্ত্রের জোরে নয়। আরব ¯িপ্রবৃত্ত সবার জানা।
নতুন উদ্ভাবিত প্রযুক্তির সম্প্রসারণে বড় বাধা যে কোন রাষ্ট্রের আমলাতন্ত্র এবং সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আমলাতন্ত্র সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী। তারা তথ্য ও প্রযুক্তির সম্প্রসারণে সব সময়ই বাধার সৃষ্টি করে থাকে। বাহ্যিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যেমন অনেক অমানবিক কার্য চলতে পারে তেমনি শ্রমিক জনগনকে কর্মবিমুখ করে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে তাদের অগ্রযাত্রাকে রুদ্ধ করা হয়। সমাজতন্ত্রের নামে স্বৈরাচারী ব্যবস্থা আজ জনগণ প্রত্যাখান করছে। মার্কসবাদ, পুঁজিবাদের শোষণ বন্ধ করার নামে কয়েক ব্যক্তির দ্বারা রাষ্ট্রীয় শোষণের ব্যবস্থা স্থির করে থাকে। একথা মার্কসবাদীদের একবারও মনে হয়নি যে, যা কিছু অমানবিক সেটা জনগণ একদিন অবশ্যই বাতিল করবে। স্বতঃস্ফূর্ততার জন্য কামান-বন্দুকের প্রয়োজন হবে না। গণতন্ত্র যেমন সাধারণ মানুষকে মুক্তি দিতে পারছে না এবং মুক্তির অন্বেষায় বিকল্প পথ খুঁজছে, অপরদিকে সমাজতন্ত্রীরা তাড়াহুড়া কওে জনগণকে বাদ দিয়ে তাদের কল্যাণের পথ খুঁজতে গিয়ে সেটা ভ্রান্তির চোরাগলিতে হারিয়ে ফেলেছে। তাত্ত্বিকের তত্ত্বের আলোতে পথ খুঁজতে সমাজতন্ত্রীরা পথ হারিয়েছেন।
এমন একদিন হয়তো আসবে যখন মুক্তির অন্বেষায় সমাজতন্ত্রের মত গণতন্ত্রকেও বাদ দিয়ে মেহনতি মানুষ মুক্তির লক্ষ্যে বিকল্প পথ খুঁজতে বাধ্য হবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.