নেতৃত্ব
সমাজের বিত্তশালীরা গ্রাম্যশালিশ, বিচারসহ সকল প্রকার নেতৃত্বের অধিকারী। স্থানীয় সম্পদেও তাদের একচেটিয় কর্তৃত্ব। প্রশাসনের সাথে তাদের বন্ধু সুলভ সম্পুর্ক তাই সরকারি-বেসরকারি সকল প্রকার সুযোগ-সুবিধা তারাই ভোগ করে থাকে। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে। তারাই সম্মানিত আসনটি পায়। সাধারণ মানুষ তাদেরকেই জনপ্রতিনিধি নির্বচন করে থাকে। এভাবে সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ দরিদ্র মানুষ সামাজিক শোষণের শিকার হয়। তবুও তারা বিত্তশালীদেরকেই তাদের নেতা বলে মেনে নেয়।
দরিদ্র জনগোষ্ঠির ধারণা যে, শুধু দাসত্ব করার জন্যই তাদের জন্ম। বিত্ত-বৈভবে যারা শক্তিশালী তারাই হবে সমাজের নেতা। ন্যায়-অন্যায় যা কিছু তারা করবে সব কিছুই তাদের মেনে নিতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ সকল প্রকার সামাজিক প্রতিষ্ঠানেও রয়েছে বিত্তশালীদের কর্তৃত্ব। সকল প্রকার জাতীয় সুযোগ-সুবিধার সিংহভাগও ভোগ করে তারা। আর অন্যায়-অত্যাচার নীরবে সহ্য করে দরিদ্ররা। ধনীদের জুলুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিকারের জন্য আইন আদালতে তো দুরের কথা, থানা-পুলিশে যেতে সাহসী হয় না। তাদের ভীতি, ধনীদের টাকা-পয়সা আছে, অর্থ দিয়ে তারা প্রশাসনের কল-কাঠি নাড়াচাড়া করে। অভিযোগ দিলেও প্রতিকার পাওয়া যায় না বরং নিজেরাই হয়রানীর শিকার হয়। গরিবের জন্য বিচারের বাণী যেন নীরবে কাঁদে। বিত্তহীন দরিদ্র মানুষ তাই অসহায় অবস্থা মেনে নেয়া ছাড়া কোন পথ খুঁজে পায় না। জুলুমের পরাকাষ্ঠা জগদ্দল পাথরের মত হোতাদের মাথার উপর চেপে বসেছে, না পারছে বইতে না পারছে সইতে। পুঁজিবাদী বিশ্বেও গড়গ সমাজ ব্যবস্থায় এভাবেই অসহায় দরিদ্র জিিত দিন দিন শেষ হয়ে যাচ্ছে । কবির ভাষায়, “বুকে বড় আশা মুখে নেই ভাষা”। ইতিহাস ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ বিশ্বের সংখ্যা-গরিষ্ঠ দরিদ্র জাতির আজ এই দুর্গতি কেন? দুরিদ্র বিশ্বেও সমস্ত কৃষককূল, শ্রমিক, সাধারণ পেশাজীবীসহ সকল মেহনতি মানূষই দঃখ-দুর্দশা, হতাশা, অপমান, লাঞ্ছনা আর বঞ্চনার শিকার। তাদের মধ্যে একতা নেই, তারা অজ্ঞ, অসচেতন সরলপ্রাণ মানুষ। শিক্ষার ব্যয়-ভার তারা বহন করতে অক্ষম, জীবনোপায়ের চিন্তা তাদের আচ্ছন্ন করে রাখে সারাক্ষণ। উপরের সিঁড়িতে উঠার প্রতিযোগিতায় তারা যাচ্ছে হেরে। স্বাধীনতার স্বাদ থেকে তারা বঞ্চিত। কারণ অর্থনৈতিক মুক্তি, সামাজিক ন্যায় বিচার এবং ন্যায়-নীতি ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা ছাড়া স্বাধীনতা নিষ্ফল। বুর্জোয়া সমাজ ব্যবস্থায় গণতন্ত্রের লেবাস পড়ে পুঁজিবাদী বিশ্বের দোসররা গোটা প্রশাসন ব্যবস্থাকে করে রেখেছে তাদের হাতের ক্রীড়ানক। তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার উপর নির্ভর করে দরিদ্র মানুষের ভাগ্য।
অপরদিকে প্রভু আর দাসত্বের মনোভাব গড়ে উঠার কারণে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন জাতি ও দেশের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটছে। অনেক সময় তা যুদ্ধ-বিগ্রহের রুপও পরিগ্রহ করছে। বাণিজ্যিক শোষণ ব্যর্থ হলেই ধনী দেশগুলো সাহায্য-সহযোগিতার পরিবর্তে দরিদ্র দেশগুলোর উপর এমন বোঝা চাপিয়ে দেয় বা কৌশলে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করে যাতে করে ধনীদেশগুলোর বাণিজ্যিক শোষণের দুয়ার এমনিতেই খুলে যায়, বন্ধুত্বের পরিবর্তে তখন সৃষ্টি হয় প্রভু আর ভৃত্যের সম্পর্ক । যেখানে প্রভু আর ভৃত্যের সম্পর্ক, শাসক আর শোষিতের প্রশ্ন সেখানে পারস্পারিক সম্পর্ক মজবুত বা দৃঢ় হতে পারে না। অথচ মানুষের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য সকল মৌলিক প্রয়োজন পূরণ হতে পারে না যতক্ষণ না আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে পারস্পারিক সম্পর্ক উন্নত ও মজবুত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হয়। সম্ভবত বর্ষীয়ান আর স্বনামধন্য রাজনীতিবিদরা এ কথাটি আদৌ মনে করছেন না।