ন্যাচারোপ্যাথিঃ শরীরের মধ্যেই রয়েছে সকল রোগ নিরাময়ের ক্ষমতা। যদি শরীরকে দেয়া যায় তার প্রকৃতপক্ষে যা প্রয়োজন যেমনঃ সঠিক খাদ্য, নিরাপদ পানি, দূষণমুক্ত বাতাস, সূর্য্যের আলো, ব্যায়াম এবং বিশ্রাম। শরীর, মন ও উদ্যম একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত। ন্যাচারোপ্যাথি সে কথাই বলে।
পারমাথেরাপিঃ পারমাথেরাপি হলো স্থায়ীভাবে রোগ প্রতিরোধ ও নিরাময় ব্যবস্থা। পারমাথেরাপি বর্তমানে বিশ্বে যত রকম রোগ নিরাময় ব্যবস্থা আছে তার নির্যাস। পারমাথেরাপি মতে পৃথিবীতে এমন কোন রোগ নেই যার চিকিৎসা বা নিরাময় ব্যবস্থা নেই। পারমাথেরাপি প্রাচীন লোকায়ত নিরাময়ক জ্ঞান ও পদ্ধতির সাথে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের সমন্বয় করেছে। পারমাথেরাপি যেকোন রোগের স্থায়ী ও চূড়ান্ত নিরাময় পদ্ধতি। পারমাথেরাপি আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের নিরাপদ প্রযুক্তি ও প্রাচীনকালের আবিষ্কৃত নিরাময় পদ্ধতি একই সাথে প্রয়োগ করে ফলে রোগ স্থায়ীভাবে নিরাময় ত্বরান্বিত হয় এবং শরীরের দূভের্দ্য প্রতিরোধ শক্তি গড়ে ওঠে।
ড. নিম হাকিমের সুদীর্ঘ গবেষণায় উদ্ভাবিত ন্যাচারোপ্যাথি ও পারমাথেরাপি মৌলিক আবিষ্কার হিসেবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক কপিরাইটকৃত।
ন্যাচারোপ্যাথি ও পারমাথেরাপির সাথে রয়েছে মৌলিক চাহিদার ওতপ্রোত সম্পর্ক।
১. খাদ্য ২. বস্ত্র ৩. বাসস্থান ৪. শিক্ষা ৫. চিকিৎসা ৬. বিনোদন
খাদ্যঃ খাদ্য দেহের পুষ্টি যোগায়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, কর্ম ক্ষমতা বাড়ায়। শারীরিক স্বাস্থ্য, মানসিক স্বাস্থ্য ও যৌন স্বাস্থ্য ভাল রাখে। খাদ্যের নানা প্রকারের মধ্যে প্রধানত ১. শর্করা ২. তৈল বা চর্বি ৩. প্রোটিন ৪. ভিটামিন
অঞ্চল ভেদে যেসব জায়গায় যে ধরনের খাদ্য যেসব ঋতুতে জন্মায় হোক তা শস্যজাতীয়, ফলদ, সবজী, মৎস্য বা অন্য কোন প্রকার তা ঐ অঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য উপযোগী। প্রাকৃতিক চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং গবেষণায় তা প্রমাণিত হয়েছে।
কোন খাদ্য শস্য, ফল বা সবজী, মাছ বা মাংসের উৎস বিবেচনায় নিয়ে তা খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করা উচিৎ। কৃত্রিম উপায়ে বা রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করে, ভূ-গর্ভস্থ পানির সেচ দিয়ে, হাইব্রিড, জিএমও বা জেনেটিক্যালি মোডিফাইড প্রকৃতির খাদ্য গ্রহণ স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্বক ঝুঁকিপূর্ণ ও ক্ষতিকর। এসব খাদ্য গ্রহণে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। এমন কি জেনেটিক্যাল ডিজঅর্ডার বা জন্মগতিতে পরিবর্তনও হতে পারে যা মানব জাতীর জন্য খুবই ভয়াবহ। সাম্প্রতিক হাইব্রিড ও জিএমও খাদ্য গ্রহণের ফলে মানুষ ও অন্যান্য গৃহপালিত জীবজন্তুর শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ায় রোগব্যাধির আক্রমন বেড়ে যাচ্ছে তাই হাসপাতাল গুলোতে রোগাক্রান্ত, শারীরিক ও মানুষিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ মানুষ ও গৃহপালিত পশুপাখির সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। এমন কি এসব হাইব্রিড, জিএমও, কৃত্রিম রং, সুগন্ধি, প্রিজারভেটিভ ও এডিটিভস মিশানো খাদ্য গ্রহণের ফলে গর্ভবতী মায়েদের গর্ভের সন্তান পরিপূর্ণ পুষ্টি না পেয়ে এবং শরীর বৃত্তীয়তে কৃত্রিম পদার্থের ক্ষতিকর প্রভাবে তার সঠিক বিকাশ ঘটছেনা। এসব খাদ্যের ক্ষতিকর প্রভাবে গর্ভবতীদের স্বাভাবিকভাবে সন্তান প্রসাবে বিঘ্ন ঘটছে ফলে সিজারিয়ান করতে হচ্ছে । এভাবে সিজারিয়ানের ফলে প্রাকৃতিক বা স্বাভাবিকভাবে জন্মদানের ক্ষমতা নারীদের নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এবং পরপূর্ণ পুষ্টি না পাওয়া ও ক্ষতিকর খাদ্য সামগ্রীর প্রভাব নিয়ে কৃত্রিম উপায়ে জন্ম নেওয়া সন্তানদের শারীরিক, মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যহত হচ্ছে তাই অনেক ক্ষেত্রে তারা শারীরিক,মানুসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পঙ্গুত্ব বরণ করছে।
মনে রাখা উচিৎ খাদ্য ছাড়া কোন জীবের টিকে থাকার উপায় নাই তাই জীবন বাঁচানোর এই অতিপ্রয়োজনীয় উপাদান গ্রহণের আগে সতর্কতা অবলম্বন জরুরী।
যে কোন খাদ্য গ্রহণের আগে ঐ সব খাদ্যের উৎস ও জীবন চক্র বিশ্লেষণ দরকার। যেমন, আমি খাদ্য হিসেবে যা গ্রহণ করছি তার জন্ম হয়েছে কিভাবে, বেড়ে উঠেছে কিভাবে আর আমার কাছে খাদ্য হিসেবে কিভাবে উপস্থিত হলো। যেমন ধরুনঃ
১. সবজী ২. ফলফলাদি ৩. মাছ ৪. মাংস ইত্যাদি ।
সবজীঃ যে সবজী খাচ্ছি তা কি আমাদের দেশীয় বা অঞ্চলের আবহাওয়া উপযোগী? এই সবজী কি এই অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত? যে বীজ থেকে তা উৎপাদিত হয়েছে তা কি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক? না হাইব্রিড বা জেনেটিক্যালি মোডিফাইড? তা কি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ও জৈব পদ্ধতিতে উৎপাদিত হয়েছে নাকি ক্ষতিকর রাসায়নিক সার, বিষাক্ত কীটনাশক, ভূ-গর্ভস্থ সেচের পানি যাতে খনিজ পদার্থের তারতম্য রয়েছে তা দিয়ে বা ব্যবহার করে উৎপাদিত হয়েছে।
এসব শাক সবজীর উৎপাদন প্রক্রিয়ায় যেসব ক্ষতিকর ও বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার রয়েছে তা রান্নার তাপমাত্রায়ও অনেক ক্ষেত্রে নষ্ট হয়না ফলে তা খাদ্য হিসেবে আমাদের শরীর গ্রহণ করতে পারেনা। প্রথমত; হজম প্রক্রিয়ায় ব্যঘাত ঘটে, পাকস্থলী হজম করতে না পারলে তা প্যানক্রিয়াসে পাঠিয়ে দেয়, প্যানক্রিয়াস তা প্রসেস করতে না পারলে শরীরের কোথাও আটকা বা বন্দি করে রাখে ফলে এক সময় তা শারীরিক নানাবিধ সমস্যা এমনকি ক্যানসারও সৃষ্টি করতে পারে, যেমনটি চিড়িয়াখানায় আটক হিংস্র জীবজন্তু ছেড়ে দিলে তা যেমন আক্রমণাত্নক হয়।
এসব খাদ্য গ্রহণের ফলে শুধু শারীরিক স্বাস্থ্যেরই নয় এর ক্ষতিকর রাসায়নিক প্রভাবে রক্তদূষণের ফলে মানসিক ও যৌন স্বাস্থ্যও ক্ষতিগ্রস্থ হয়।
সকল প্রকার শাকসবজি ও ফলফলাদি গ্রহণের আগে এ বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া উচিৎ। শুধু শাকসবজী আর ফলফলাদিই নয় প্রক্রিয়াজাতকৃত খাদ্যসহ যেকোন প্রকার খাদ্যশস্য এবং তেল ও বীজ জাতীয় খাদ্য গ্রহণের সময়ও তা অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে।
মাছ-মাংস ও ডিমঃ মাছ মুক্ত পানিতে, গরু-ছাগল-মহিষ খোলা মাঠে, হাস-মুরগী বাড়ির আঙ্গিনায় বিচরন করবে এটাই প্রাকৃতিক নিয়ম। প্রকৃতি থেকে খাদ্য গ্রহণ করবে স্বাভাবিক জীবন ধারণের জন্য। রোগব্যাধি হলে তারা নিজের বুদ্ধিমত্তায় তা নিরাময়ের ব্যবস্থা নিবে এটাই প্রকৃতির বিধান।
যখন এসব প্রানী আটকে রেখে নিয়ন্ত্রিতভাবে তাদের খাবার সরবরাহ করা হয় তখন তাদের বৃদ্ধি ক্ষেত্র বিশেষে ব্যাহত হয় এবং ক্ষেত্র বিশেষে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটে। এসব প্রানীকে নিয়ন্ত্রণে রাখার কারনে তাদের চলাচলের স্বাধীনতা ব্যাহত হওয়ায় মানসিক, শারীরিক ও জৈবিক বিকলাঙ্গতা দেখা দেয় এবং তারা রোগাক্রান্ত হয়। অপর দিকে বাণিজ্যিক কারনে অতি ব্যবসার লোভে পালনকারী বা খামারীরা কৃত্রিম হরমোন প্রয়োগ করে দ্রুত মাংস, ডিম ও মাছের ওজন বৃদ্ধি করে থাকে। এসব মাছ-মাংস ও ডিম আমরা যখন গ্রহণ করি তখন এর মাধ্যমে শক্তিশালী ও ক্ষতিকর এন্টিবায়োটিক ও এনিমেল হরমোন আমাদের দেহে প্রবেশ করে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট করে এবং শারীরিক, মানসিক ও জৈবিক বিকলাঙ্গতা সৃষ্টি করে। এসব খাদ্য গ্রহণের ফলে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, কিডনী, লিভার ইত্যাদি নষ্ট হতে পারে। বর্তমানে ব্যাপকভাবে এসব রোগের যে প্রকোপ দেখা যাচ্ছে তার জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব হাইব্রিড, জিএমও ও কৃত্রিম ফার্মিং পদ্ধতি দায়ী।
মাছ-মাংস ও ডিম ছাড়াও প্রক্রিয়াজাতকৃত খাদ্য সামগ্রী ও ফাস্ট ফুড জাতীয় খাদ্য গ্রহণ ও স্বাস্থ্য ঝুঁকির কারন। ফাস্ট ফুড জাতীয় খাদ্যে প্রচুর পরিমানে মিনারেল সল্ট বা খনিজ লবণ মিশানো হয় যা স্বাস্থ্যের পক্ষে খুবই ক্ষতিকর। প্রক্রিয়াজকৃত খাদ্য যেমন বিস্কুট, চিপস, চানাচুর, পাউরুটি ইত্যাদি অতি চাপে ও তাপে প্রক্রিয়াজাত করণের ফলে এর খাদ্য উপাদান ও খাদ্য মূল্যমান নষ্ট হয় এবং এসব খাদ্যে কৃত্রিম রং ও ফ্লেভার মিশানোর ফলে তা স্বাস্থ্যের জন্য হুমকী হয়ে দেখা দেয়। এছাড়াও এসব খাদ্য দীর্ঘদিন সংরক্ষণের জন্য এবং স্বাদ বৃদ্ধির নিমিত্তে এসিড জাতীয় উপাদান ও প্রিজারভেটিভ মিশানো হয় যা মানব স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
পানীয়ঃ আমরা চা পান করি। চায়ের উৎস হচ্ছে উদ্ভিদ যার বৈজ্ঞানিক নাম Camellia sinensis.
আমাদের দেশে চায়ের প্রচলন যতদুর যানা যায় বৃটিশ আমল থেকে। বৃটিশরা সারা পৃথিবী জুড়ে তাদের দখলকৃত রাজ্যে তিনটি জিনিস প্রচলন করেছে আর তা হলো চা, চিনি ও তামাক অর্থাৎ Tea, Tobbaco ও Sugar সংক্ষেপে TTS.
চায়ের মধ্যে আছেঃ L- theanine, theophylline and bound caffeine.
এসব উপাদানের মধ্যে যে ক্যাফেইন আছে তা ব্যথা নাশকের কাজ করে কিন্তু ব্যথা নাশকের কাজটি করতে যেয়ে আমাদের স্নায়ুর মারাত্বক ক্ষতি করে। একবার চায়ের অভ্যাস হয়ে গেলে তা ছাড়াও কঠিন। চায়ের মধ্যে ওজন অনুপাতে কফির চেয়ে বেশী ক্যাফেইন আছে (২% থেকে ৪%)পর্যন্ত।
এবার দেখা যাক – চা আমাদের আর কি কি শারিরিক ও মানসিক ক্ষতি করেঃ
১. অতিরিক্ত গরম চা পানে খাদ্যনালীতে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়।
২.চা হজম হতে ৬ ঘন্টা সময় লাগে যা পাকস্থলীর জন্য ক্ষতিকর। চা ও কফি ছাড়া কোন
তরল পদার্থই হজম হতে ৬ ঘন্টা সময় লাগেনা।
৩.অতিরিক্ত চা পান ঘুম নষ্ট করে। মাথা যন্ত্রণা ও মানসিক চাপ বা ধকল বাড়ায়।
৪.গরম চা মুখ গহ্বরের ঝিল্লির ক্ষতি করে এবং খাদ্য ও পানির সঠিক স্বাদ পাওয়া যায়না।
৫. খালি পেটে চা পানে হজম শক্তি নষ্ট হয়। হজমে ব্যবহৃত জারক রস তরলীকৃত ও
নিস্তেজ করে।
চা উৎপাদনে রাসায়নিক সার ও মারাত্বক ক্ষতিকর কীটনাশক ব্যবহার হয়। এমন অনেক কীটনাশক ব্যবহার হয় তা ২০০০ সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় ও তার ক্ষতিকর প্রভাব রয়ে যায়। চায়ের সাথে ঐসব মারাত্মক কীটনাশক মানুষের পেটে গিয়ে রক্তে মিশে যায় ফলে মরণঘাতি ক্যানসারসহ অন্যান্য ভয়াবহ ও মারাত্মক নিরাময়হীন রোগ হতে পারে বা হয়ে থাকে। অবশ্য জৈব পদ্ধতি বা রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ছাড়া উৎপাদিত ব্লাক বা গ্রীন টি উদ্দীপনা বা ঊত্তেজনা বৃদ্ধি করে।
যারা চা চাষ করেঃ চা শ্রমিকদের তৎকালীন বৃটিশ সরকার আসাম রাজ্য থেকে জোড় পুর্বক ধরে নিয়ে এসে চা চাষে বাধ্য করে। তারা আজও সভ্যতার আধুনিক কৃতদাস! সামান্য মুজুরীতে তাদের কঠিন শ্রম দিতে হয়। ছেলে মেয়েদের লেখাপড়া ও সু-চিকিৎসার তেমন কোন ব্যবস্থা নেই। গর্ভবতী মায়েদের গর্ভকালীন কোন পুষ্টিকর খাবার ব্যবস্থা নেই। গর্ভ ও প্রসূতী কালীন কোন ছুটির ব্যবস্থা নেই। দুগ্ধ-পোষ্য বাচ্চাদের কাপড়ের ঝুলিয়ে রেখে বাগানে কাজ করতে হয়। এসব শিশু ও বাগানের বিচরণরত কুকুর একসাথে ঘুমোয়। মারাত্মক কীটনাশক অতিরিক্ত মাত্রায় ব্যবহারে তার বিষক্রিয়া বাতাসে মিশে এসব শিশু,মা ও শ্রমিকদের নিঃশ্বাস দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে ভয়াবহ রোগ-ব্যাধির জন্ম দেয়।
অনেক ক্ষেত্রে তাদের বংশগতিতে বিকলাঙ্গতা দেখা যায়। তারা যাতে সুস্থ্য চিন্তা ভাবনা ও অধিকার আদায়ে সোচ্চার না হয় তার জন্য এখনও আছে সেই ব্রিটিশ প্রচলিত বাংলা মদের রেশন ব্যবস্থা। দিনে কাজ, রাতে মদ খেয়ে বুদ হয়ে ঘুমানো।
অপ্রাপ্ত বয়সে বিয়ে এবং সন্তান পয়দা, যাতে করে যত বেশী সন্তান উৎপাদন ততবেশী শ্রমিক-চা বাগান মালিকদের এতে শুধুই লাভ আর লাভ।
চা পানে এত ভয়ানক ক্ষতি, আর চা-শ্রমিকদের প্রতি বংশ পরম্পরায় মালিকদের এই অমানবিক আচরণ, এতে কি নৈতিক ভাবে চা পান করা যায় ???
আমরা কি খাচ্ছিঃ আমাদের জীবনই শুধু নয় সমস্ত জীবকুলের জন্য চারটি জিনিস খুবই গুরুত্বপূর্ণ আর তা হলোঃ খাদ্য (Food), পানি (Water), বাতাস (Air) ও জ্বালানী (Energy)। খাদ্য যদি নিরাপদ না হয়, পানি ও বাতাস যদি বিশুদ্ধ না থাকে আর জ্বালানী যদি স্বাস্থ্য সম্মত না হয় তবে বিপদ অনিবার্য। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে এই চারটি বিষয়ের প্রতি তেমন গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না। যেখানে মানুষ ক্ষুধার্ত, পানীয় জলের স্বল্পতা, সেখানে মানুষ বাতাস আর জ্বালানীর প্রতি কমই গুরুত্ব দিয়ে থাকে। বাচাঁর জন্য খাদ্যের প্রয়োজন কিন্তু সেই খাদ্যেই যদি হয় মরন তাহলে মানুষ খাবে কি? পানির অপর নাম জীবন আর সেই জীবন যদি হয় মরন তাহলে অবস্থা হবে কি? নিঃশ্বাস না থাকলে জীবন থাকবে না। খাদ্য না খেয়ে বেশ কিছুদিন বাঁচা যায় কিন্তু অক্সিজেন বা পরিশুদ্ধ বাতাস না হলে একমুহুর্তও কোন প্রানী বাঁচবে না। জীবন চলে জ্বালানীতে আর সে জ্বালানী যদি দূষনমুক্ত না তাহলে জীবনের কি হবে?
জীবনের সাথে সম্পৃক্ত এই চারটি বিষয় নিয়ে এখন ভাববার সময় এসেছে টিকে থাকার স্বার্থে। সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষ স্বাস্থ্য সচেতন নয় কারণ তারা অদৃশ্যমান ভয়াবহ ক্ষতির কথা জানে না। রাষ্ট্রযন্ত্রও অনেক কারণে জনগণকে তা জানায় না। বিবেকবান মানুষ হিসেবে বর্তমানে জনস্বাস্থ্য যে ভয়াবহ হুমকীর সম্মুখীন তা চিন্তা করেই আমার এ লেখা।
খাদ্য সামগ্রীঃ আমরা কি খাচ্ছি? সহজ কথার উত্তর হলো মানুষ হিসেবে যা খেয়ে জীবন ধারণ করা যায়। আমরা প্রতিনিয়ত যা খাচ্ছি তাতে কি জীবন রক্ষা পাচ্ছে? এক কথার উত্তর হলো না। তাহলে কি খাব? এ প্রশ্নের উত্তর কঠিন তবে বিকল্প আছে। হয়তো তা আমাদের নাগালের বাইরে কিন্তু অসাধ্য নয়।
খাদ্য সামগ্রীর মধ্যে আমরা যা প্রতিনিয়ত খাই তাহলো- ভাত বা রুটি, মাছ, মাংস, ডিম, শাক সবজী ইত্যাদি। এক সময় কথা ছিল ‘দুধে ভাতে বাঙ্গালী’ তার পর ‘মাছে ভাতে বাঙ্গালী’ এর পর হলো ‘ডাল ভাতে বাঙ্গালী’ এখন ‘শাক ভাতে বাঙ্গালী’। এই হলো আমাদের বর্তমান অবস্থা।
ভাত চাল থেকে হয়, আর চাল হয় ধান থেকে। মানুষ অনেক বেশী, ধান জন্মানোর জমি অনেক কম, তাই কম জমিতে অধিক ধান জন্মায়ে সাড়ে পনের কোটি মানুষের মুখে অন্ন দেয়া প্রয়োজন। আর সেই কারণে অধিক ধান ফলাতে নব প্রযুক্তি জিএমও বা জেনেটিকেলী মোডিফাইট অর্গানিজম প্রযুক্তির আয়োজন। এই হলো এক কথায়, আমাদের বৈজ্ঞানিকদের ব্যাখ্যা। ভারতের একটি গবেষণায় দেখা গেছে রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও সেচের পানি দিয়ে উৎপাদিত হাইব্রিড ধানের চাউলে যা দিয়ে ভাত হয় তার ১২ কেজিতে যে পরিমান নিউট্রিয়েন্ট আছে সে পরিমান নিউট্রিয়েন্ট জৈবপদ্ধতিতে উৎপাদিত ৭ কেজিতে বিদ্যমান। অর্থাৎ হাইব্রিডের ১২ কেজি সমান প্রাকৃতিক বা জৈব পদ্ধতিতে উৎপাদিত ৭ কেজির সমান।
উৎপাদন মাত্রা আর পুষ্টি উপাদানের মাত্রার হিসাব কষলে বিষয়টি বোধ হয় পরিষ্কার হয়ে যাবে। যখন হাইব্রিডাইজড বা জেনেটিকেলী মোডিফাইড যে কোন ফসল উৎপাদনে অবশ্যই প্রয়োজন হবে সেচের পানি, অধিকাংশ বিদেশী বীজ, রাসায়নিক সার ও কীটনাশক। অথচ এ পদ্ধতিতে উৎপাদনের জন্য যে সকল প্রযুক্তি, উপাদান ও উকপরণ প্রয়োজন তার কোনটিরই মালিকানা কৃষকের হাতে নেই, আছে শুধু শারীরিক শ্রম। অবশিষ্ট সব কিছুই তাকে টাকা দিয়ে কিনতে হবে। আর সেই টাকাগুলো কোথায় যাবে? তা কৃষক জানে না। শ্রম দিয়ে সে যা উৎপাদন করলো তাতে তার খাবার হয়তো জুটলো কিন্তু ফলাফল কি হলো? সে যে খাদ্য উৎপাদন করলো তাতে পুষ্টিগুন হলো প্রায় অর্ধেক। শ্রম নষ্ট হলো পুরোপুরি। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া যা হলো তা সে মোটেও বুঝল না। ভূগর্ভ থেকে পানি তুলতে খরচ হলো অনেক টাকা, নেমে গেল পানির স্তর, ফলে মরুকরণ শুরুর প্রক্রিয়া হলো ত্বরান্বিত। টাকা খরচ করে কিনতে হলো রাসায়নিক সার তাতে জমি হয়ে গেল বন্ধ্যা, সার না দিয়ে আর কখনও ঐ জমিতে কোন ফসল ফলানো যাবে না। প্রশ্নটা হলো এমন যে, “আমার থেকে কিছু নিতে হলে কিছু দাও, ক্ষতির বোঝা তুমি বহ”। সার আর সেচ দিয়ে কৃষক ফলালো ফসল, দিল তাতে কীট দমনের জন্য বিষ। দমন হলো ফসল উঠলো কেটে ঘরে কিন্তু জীববৈচিত্রের কি হলো? কোথায় হারিয়ে গেলো- মাছ, ব্যাঙ, কচ্ছপ, শামুক, ঝিনুক, পাখী আরো অনেক অনেক কিছু। যারা মশা খেতে, কীট পতঙ্গ খেত, ইদুঁর মারতো, যে ইদুঁর ১০% ফসল নষ্ট করে। বিষাক্ত হলো পানি, তা আর গরু ছাগল পশু পাখী কেন মানুষেরও পান করার উপায় নেই। মাটির গভীর থেকে পান করার পানি তুলে পান করছি তাতেও আর্সেনিক। মাটির গভীর থেকে পানি তুলে ফসল উৎপাদন তাতেও আর্সেনিক। খাদ্য শৃংঙ্খলের সাথে সে আর্সেনিক মানুষ ও ফসল ভোজী সকল প্রাণীর দেহে ছড়িয়ে পড়ল বিষ। জীবন হলো হুমকীর সম্মুখীন।
মাছ খাব? কিভাবে? মাছে ছড়িয়ে যাচ্ছে বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ। শুধুই কি তাই, মাছ সংরক্ষণের জন্য মাখা হচ্ছে ফরমালিন তা খাচ্ছি আমরা আর হয়ে পড়েছি রোগাক্রান্ত নষ্ট হচ্ছে উৎপাদন ক্ষমতা মানসিক ভাবে পঙ্গু হয়ে জন্ম নিচ্ছে আমাদের শিশু। বংশগতিতে ছড়িয়ে পড়ছে এই ভয়াবহ বিষ। ভবিষ্যৎ বংশধরদের অবস্থা কি হবে তা কে জানে।
সমাজবিজ্ঞানী আর জেনেটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ভাইয়েরা বোধ হয় এর সঠিক উত্তর দিতে পারবেন যে এর পরিনতি কি? সামাজিক অস্থিরতা আর অপরাধ প্রবনতার সাথে এর কোন সম্পর্কই বা আছে কিনা?
মাংস খাব? কি ভাবে খাব? মাংসের জন্য গরু ছাগল করা হচ্ছে মোটা তাজা। মোরগ মুরগীকেও দেয়া হচ্ছে তৈরী খাদ্য যাতে মিশানো হচ্ছে এন্টিবায়োটিক আর গ্রোথ হরমোন। পক্ষান্তরে তো তা আমরাই খাচ্ছি। এই এন্টিবায়োটিক, বিষাক্ত ক্লোরিন, ফরমালিন আর হরমোন তো আমাদের দেহেই যাচ্ছে। আর এর প্রভাবে আমাদের যা হচ্ছে তা হলো ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, কিডনি বিনষ্ট এবং ক্যান্সার। Dance with dangerous diseases অর্থাৎ “বিপদ সংকুল রোগের সাথে নৃত্য”।
সবকিছুর পরে খাবার যখন টেবিলে আসলো তখন প্রশ্ন হলো কি দিয়ে রান্না হলো। মানুষের খাদ্য অনুপোযোগী তেল দিয়ে রান্না, কৃত্রিম রং মিশানোর যে কোন খাদ্যমূল্য বিনষ্ট হয়ে পরিণত হচ্ছে Junk Food এ যেমনটি আসে আমাদের ই-মেইল হিসেবে আসে Junk Mail বক্সে।
কিছু উদাহরণ দিয়ে এ বিষয়ের ইতি টানতে চাই :
১। একটি বাস্তব ঘটনা তা হলোঃ গরু মোটা তাজা করার জন্য গ্রোথ হরমোন আর এন্টিবায়োটিক দেয়া হয়েছে যখন গরুটি পায়খানা করলো তখন কিছু গোবর পোকা তা খেলো। দেখা গেলো খাওয়ার পর সব গোবরে পোকা মারা গেছে। কেন মারা গেল আমাদের বৈজ্ঞানিকদের কাছে সেই প্রশ্নটি করতে চাই। যে গরুর বিষাক্ত গোবরে পোকা পর্যন্ত মারা যায় অথচ আমরা ঐ গরুর মাংস খাই।
২। যশোরের কোন একটি এলাকায় হাইব্রিড ফসলে ব্যাপক কীটপতঙ্গ আর রোগের প্রাদুর্ভাব হলো। কৃষক ছাই, কীটনাশক দিলো কিন্তু কিছুতেই দমন হলো না। তাকে একজন বুদ্ধি দিলো, তুমি ডিডিটি দাও। যে পানির সঙ্গে মিশিয়ে ডিডিটি দিলো দেখল সাপ, ব্যাঙ, কচ্ছপ তো মরে ভেসে উঠেছেই অন্য কোন কীটপতঙ্গ নেই তার চিন্তার অবসান হলো। ফসল তুলে বাজারে বিক্রি করে সে পয়সা পেলো। মানুষ সেই ফসল খেলো কিন্তু সে বুঝতে পারলো না যে, সে কি ধ্বংস করলো আর এই ধ্বংসের পরিনাম কি হবে। ভোক্তারা সেই ফসল খেল কিন্তু ৫০ বছর পর্যন্ত এই বিষ যে তা শরীরে ও রক্তে থাকবে এবং অবশেষে তা ক্যান্সারে পরিণত হবে তা রয়ে গেল অজানা।
মাছ, মাংস ও ডিমঃ ডিম আমাদের অন্যতম খাদ্য। ছোট ডিম বাজার থেকে আমরা কিনি না। দেখতে ছোট রং ভালো না। বড় ডিম, ভাল রং বেশী খাদ্য। তাই চকচকা বড় ডিম কিনব। ডিম যে মুরগী দিয়েছে তাকে যে, ট্যানারীর বিষাক্ত বর্জ্য থেকে তৈরী খাদ্য খাওয়ানো হয়েছে তা কিন্তু ক্রেতা জানে না। আর ঐ ডিমে যে রয়েছে উচ্চ মাত্রার ক্রোমিয়াম ও সীসা যা খেলে ক্যান্সারই নয় বংশগতভাবে বিপর্যয় হতে পারে তা সে জানে না। ট্যানারির এই বর্জ্য দিয়ে তৈরী হচ্ছে মাছ ও মুরগীর খাদ্য। ভয়ংকর এই বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ মাছ ও মুরগী থেকে সরাসরি প্রবেশ করছে মানবদেহে। মানবদেহে এগুলো কখনও হজম করতে পারবে না ফলে থেকে যাবে দেহে ও রক্তে। এক সময় তা প্রকাশিত হবে ভয়াবহ ক্যান্সার হিসেবে তখন আর তার কিছুই করার থাকবে না। বিকল হয়ে হয়ে যাবে কিডনি, বন্ধ হয়ে যাবে হৃদপিন্ড, ঘা হবে লিভারে, অচল হবে ফুসফুস এবং স্মৃতি শক্তিও লোপ পাবে। তার জন্ম দেয়া ভবিষৎ বংশধরদের এতকিছু ঘটছে নিরবে, শত সহস্র মানুষের কিন্তু কেন এমন হলো? প্রশ্নের উত্তর না পেতেই তার জীবন সাঙ্গ হলো।
পানিঃ কিছু মানব বিজ্ঞানী আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধ হবে পানি নিয়ে। আমার মনে হয় তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধ হওয়ার আগেই মানুষ পানি নিয়ে যুদ্ধ করে শেষ হয়ে যাবে পৃথিবী থেকে। যখন এত পরিশুদ্ধ করার যন্ত্রপাতি ছিল না, তখন মানুষ পানি খেত কিভাবে? এখন খালবিল, নদীনালা আর নলকূপের পানি খাওয়া দূরের কথা গোসল করাও যায় না। পানি যার অপর নাম জীবন তা টুকে গেছে প্লাস্টিকের বোতলে। এতেও কি পানি নিরাপদ? কে ভরছে তা বোতলে, কোথায় থেকে আসছে তা কে জানে? মিনারেল ওয়াটার কি বাংলাদেশে তৈরী হয়? আর কি স্বাদ আমরা তা কি জানি? সবই দুঃখের পরিহাস! বিশুদ্ধ পানি, পরিশোধিত পানি কতই না লেবেল। রান্না-বান্নার পানির খবর কি? তা কি আমরা জানি? ঘরে বসে টেপের পানি পান করি কোথা থেকে আসল? কোন পাইপ দিয়ে? সে পাইপ থেকে পানির মধ্যে কোন বিষাক্ত পদার্থ গেল কি না কে জানে? পাইপগুলো কি সত্যি স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ তার উত্তর কে জানে? কি দিয়ে পানি শোধন করা হয়েছে? যে উৎস থেকে এই পানি ঢাকা শহরে আনা হলো সে উৎসে কি পেট্রোলিয়াম, ক্লোরিন আর অন্য কোন বিষাক্ত রাসায়নিক ছিল? আর যা দিয়ে শোধন করা হলো সেই ক্লোরিনের মাত্রা কি মানব স্বাস্থ্যের জন্য উপযোগী? তাতো কোন বৈজ্ঞানিক বললেন না। ক্লোরিনে যে পেটে আলসার হয়, ক্যান্সার হয়, স্মৃতি শক্তি লোপ পায় তার কোন সতর্কবানী তো পানি দিয়ে ভাত, মাছ, মাংস আর শাকসবজী রান্না করছি তা কি নিরাপদ? পরিশোধিত পানির ক্লোরিন আর প্রাকৃতিক ঝরনার পানির গ্রাডিয়া নামক জীবানু কি ১০০% তাপমাত্রায় মারা যায়, না কি সে গুলো পেটে যেয়ে হজমে ব্যাঘাত ঘটায়? আর যদি নাই ঘটায় তাহলে ১০০ ভাগের মধ্যে ৯৫ ভাগ রোগ ব্যাধি কেন পাকস্থলী বা পেট থেকে উৎপন্ন হয়। এমনকি তা কালে কালে ক্যান্সারেও রূপান্তরিত হয়। খাদ্য আর পানি যা সরাসরি পেটে যায় যা দিয়ে জীবন রক্ষা পায় তাহলে তার প্রতি এত অবহেলা কেন? চর্মরোগ আর ভয়াবহ স্কীন ক্যান্সারের জন্য কেন এত ভূগতে হচ্ছে? বৈজ্ঞানিক ভায়েরা কি গবেষনা করে দেখতে পারেন না যে খাদ্য আর পানির এই ভয়াবহ অবস্থা আর এত নিত্য নতুন রোগের প্রাদুর্ভাব কেন?
বাতাসঃ জীবন বাঁচাতে হলে প্রকৃতি থেকে তো বাতাস নিতেই হবে। আমরা তো হাসপাতালের ওটি আর ইনকিউবিসনের বাসিন্দা নই যে, কৃত্রিম বিশুদ্ধ অক্সিজেন দিয়ে বেঁচে থাকব। আমাদের তো প্রাকৃতিক উৎস থেকেই অক্সিজেন নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে। নাক টেকে রেখে কতক্ষণ থাকব। বাঁচার জন্য বিশুদ্ধ অক্সিজেন প্রয়োজন। সেই অক্সিজেনের কি অবস্থা। গ্রাম ছেড়ে আমরা তথাকথিত শিক্ষিত আর ভদ্র সমাজ এখন শহরের বাসিন্দা। আমরাই এখন কৃষ্টি আর সংস্কৃতির ধারক-বাহক। আমাদের আসলে কি অবস্থা। চালাচ্ছি দামী গাড়ী, করছি বড় বড় বাড়ী, ধ্বংস করছি গাছপালা যেখানে গড়ছি সুরম্য অট্টালিকা। অল্প জায়গায় অতিরিক্ত মানুষ, অনেক অক্সিজেন প্রয়োজন তাহলে তা পাব কোথায়? আমাদের কি আছে অক্সিজেনের ফ্যাক্টরী? গাছ কেটে দালান গড়ে করছি আধুনিকতার প্রতিযোগীতা। একি বাঁচার প্রতিযোগীতা না মরার প্রতিযোগীতা?
রাস্তাঘাটে যেখানে যেভাবে বিচরণ করছি আমরা ভেবে কি দেখছি একবারও কেন এবং কিসের জন্য এই প্রতিযোগীতা, বাতাসে বিষাক্ত সীসার অতিমাত্রা, ক্রোমিয়ামের বৃদ্ধি সব কিছুই যে আমাদের গ্রাস করতে চলছে তা নিয়ে আমরা ভাবছি। আমি কিভাবে বাঁচবো? অন্যদের কথা না হয় বাদই দিলাম আমার নিঃশ্বাস ফেলার জন্য অক্সিজেন প্রয়োজন। আর তার জন্য আমি কোন কিছুই করছি এই ধরিত্রীর!
জ্বালানীঃ জ্বালানী দিয়ে কি হবে। গাড়ী চালাব, পানি গরম করব না খাদ্য সামগ্রী রান্না করব? এর সব কিছুই আমাদের প্রয়োজন। এগুলো না হলে আমাদের জীবন চলবে না এটা আমাদের সবারই সত্য অনুধাবন। কয়লা পোড়াচ্ছি যা কিনা ফসিল ফুয়েল। পেট্রোলিয়াম জ্বালাচ্ছি অবিরাম তাও প্রয়োজনে না হয় বুঝলাম কিন্তু আমাদের এই কর্মাকান্ডের ফলে হচ্ছেটা কি তা বুঝলাম না।
সারাবিশ্বে সর্বাধিক বিক্রিত পানীয় হলো সফ্ট ড্রিংকস। এই পানীয় কিভাবে মানুষকে নীরব ঘাতক হিসেবে গ্রাস করছে তা বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।
ওজন বৃদ্ধি করেঃ ওজন বাড়লে আপনি অনায়াসে যে অসুখগুলোতে আক্রান্ত হবেন তা হলো টাইপ টু ডায়াবেটিস, হাই ব্লাড প্রেসার, স্ট্রোক, হার্ট এটাক, ক্যান্সার, গলব্লাডারে পাথর, আথ্যাইটিস। পরিণামে অকাল মৃত্যু। ওজন বৃদ্ধি বা মোটা হওয়া মানে শুধু দেখতে দেখতে খারাপ বা শারীরিক অস্বস্থিকর ব্যাপারই নয়, এটি নানাবিধ শারীরিক সমস্যা তৈরি করে থাকে। গবেষণা অনুসারে মোটা হওয়ার সঙ্গে কোমল পানীয় বা সফ্ট ড্রিংকস এর সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। বোস্টনের শিশু হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগ এবং হার্ভার্ড স্কুল একসাথে গবেষণা করে যা বের করেছে তা হলো, একটি শিশু যদি প্রতিদিন একটা করে বাড়তি সফ্ট ড্রিংকস খায় তাহলে তার ওজন বাড়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায় ৬০%। এক বোতল বা এক ক্যান সফ্ট ড্রিংকসে ক্যালরির পরিমাণ হলো ১০ চামচ চিনির সমান। এ পরিমান ক্যালরি ঝরাতে সপ্তাহে আপনাকে ভারি ব্যায়াম করতে হবে সাড়ে চার ঘন্টারও বেশী।
দাঁত হলুদ বানায়ঃ ধরুন আপনি আপনার বন্ধুদের একটা জাদু দেখাতে চান। আপনার ধবধবে সাদা মুক্তোর মতো দাঁতগুলোকে আপনি ১ ঘন্টার মধ্যে স্থায়ীভাবে হলুদ করে ফেলবেন। কিছুই না, এক ঢোক কোলা মুখে নিয়ে ১ ঘন্টা ধরে রেখে দিন। ব্যস, এনামেল ক্ষয়ে দাঁতগুলো হলুদ হয়ে যাবে। সফ্ট ড্রিংকসের ঝাঁঝালো স্বাদ বাড়ানোর জন্যে এতে ফসফরিক এসিড ব্যবহার করা হয়। এ এসিড এত শক্তিশালী যে, একটা নখ এর মধ্যে ডুবিয়ে রাখলে ৪ দিন পর আর আপনি নখ টাকে খুঁজে পাবেন না। তাছাড়া সফ্ট ড্রিংকসে যে চিনি ব্যবহার করা হয়, ব্যাকটেরিয়ার প্রভাবে এটাও এসিড তৈরি করে।
হাড় ভঙ্গুর করেঃ ফসফরিক এসিডের আরেকটি কাজ হলো হাড়ের ক্যালসিয়ামকে ক্ষয় করা। ১৯৯৪ সালে টিনএজ মেয়েদের উপর চালানো হার্ভার্ডের এক গবেষণায় দেখা যায়, যে মেয়েরা সফ্ট ডিংকস পান করে অন্যদের তুলনায় তাদের হাড়ভাঙ্গার প্রবণতা ৫ গুণ বেশি। পরবর্তীকালে অষ্টিওপরোসিস নামক হাড়ের ক্ষয়জনিত একটি রোগ এতেও হতে পারে। এ রোগে হাড়ের ঘনত্ব কমে এবং গঠন দুর্বল হয়ে যায়। ফলে হাড় সহজে ভেঙ্গে যায়। সাধারণত বয়ষ্ক মহিলাদের এ রোগটি বেশি দেখা দেয়। আর আশঙ্কার কথা হলো, ভাঙ্গা হাড় আর সহজে সেরে উঠে না। ২,৫০০ প্রাপ্ত বয়স্ক মহিলার ওপর এ ধরনের আরেকটি গবেষণা চালিয়ে দেখা গেছে, এমনকি যারা নিয়মিত দুধ বা অন্যান্য ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করে তারাও কোলা জাতীয় ড্রিংকসের ক্ষতিকর এ প্রভাব থেকে মুক্ত থাকেন নি।
আসক্তি তৈরি করেঃ প্রতি বোতল সফ্ট ড্রিংকসে ক্যাফেইন আছে ৫০ মিলিগ্রামের মতো। সফ্ট ড্রিংকস কোম্পানিগুলোর দাবি-এটা তারা ব্যবহার করছে স্বাদ বাড়ানোর জন্যে। কারণ ক্যাফেইনের তেতো স্বাদ অন্যান্য ফ্লেভারকে বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু জন হপ্কিন্স মেডিকেল ইনস্টিটিউটের রোলান্ড গ্রিফিথ বেশ কয়েকজন মানুষকে বাজারের সাধারণ সফ্ট ড্রিংকস এবং ক্যাফেইন ছাড়া ড্রিংকস খেতে দিয়ে দেখেন, ৯২% মানুষই এ দু’টোর পার্থক্য বুঝতে পারেনি। তার মানে ক্যাফেইনের স্বাদের ব্যাপারটা সঠিক নয়। তাহলে ক্যাফেইন দিয়ে কী হয়? ক্যাফেইন আসলে আসক্তি সৃষ্টি করে। আপনি একবার যখন, এতে অভ্যস্ত হয়ে যাবেন আপনি তখন শুধু এটাই চাইবেন। আর সব আসক্তি সৃষ্টিকারী উপাদানের মতো ক্যাফেইনও সাময়িকভাবে আপনার মুডকে চাঙ্গা করলেও দীর্ঘমেয়াদে এর রয়েছে অনেকগুলো ক্ষতিকর দিক। এক বা দুই বোতল সফ্ট ড্রিংকসই আপনার অনিদ্রা, নার্ভাসনেস ও দ্রুত হৃদস্পন্দন সৃষ্টির জন্যে যথেষ্ট। বেশি পরিমাণে খেলে তা অনিয়মিত হৃদস্পন্দন থেকে শুরু করে আতঙ্ক এবং উদ্বেগ প্রবণতা, পেশিতে টান লাগা, অসংলগ্ন কথাবার্তা, বিষণ্নতা এবং উচ্চ রক্তচাপ সৃষ্টি করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, গর্ভবতী মহিলা যারা সফ্ট ড্রিংকস খেয়েছেন তাদের গর্ভপাত, সময়ের আগেই প্রসব বা কম ওজনের বাচ্চা জন্ম দেয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। ক্যাফেইনের আরেকটি প্রভাব হলো, এটা প্রস্রাবের প্রবণতা বাড়ায় এবং দেহকে পানিশূন্য করে ফেলে। তার মানে প্রখর রোদের মধ্যে সফ্ট ড্রিংকস খেয়ে আপনি হয়তো ভাবছেন যাক, শরীর থেকে যে ঘাম ঝরে যাচ্ছে তা পূরণ করছেন। আসলে ফলাফল তার উল্টো। তার চেয়ে বরং পানি পান করুন হজমে সহায়ক হবে।
আমরা অনেকেই রিচফুড খাওয়ার পর সফ্ট ড্রিংকস খেতে চাই এ ধারণায় যে, এতে খাবার দ্রুত হজম হবে। আমাদের দেহ সাধারণত ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় খাবার হজম করে থাকে। কিন্তু সফ্ট ড্রিংকস যখন পরিবেশন করা হয়, তখন এর তাপমাত্রা থাকে ৩/৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কাজেই খাবার গ্রহণের পর যখন ঠান্ডা কোমল পানীয় পান করা হয়, তখন হজমে তো সাহায্য করেই না, উল্টো পচন ধরায়। তাছাড়া এসিডিক হওয়ার কারণে সফ্ট ড্রিংকস পাকস্থলীর সংবেদনশীল এ্যলক্যালাইন ভারসাম্য নষ্ট করে ফেলে। ফলে পেটে ব্যথা, ফুলে যাওয়া, বদহজম, গ্যাস, টক ঢেঁকুর ইত্যাদি নানা ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হয়।
ডায়াবেটিকঃ চিনি এবং ওজন বৃদ্ধিতে এর ভূমিকার কারণে সফ্ট ড্রিংকস ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়। আমেরিকান ডায়াবেটিক এসোসিয়েশনের ৪ বছর ধরে চলন্ত এক গবেষণায় দেখা গেছে, যে মহিলারা সফ্ট ড্রিংকস বেশি খান, তাদের টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি সাধারণ মহিলাদের চেয়ে ২ গুণ বেশি।
ক্যানসারঃ সফ্ট ড্রিংকস দেহে অক্সিজেনের পরিমাণ কমিয়ে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। ক্যারামেলের রং আনার জন্যে সফ্ট ড্রিংকসে যে উপাদান ব্যবহার করা হয়, তা ক্যান্সার সৃষ্টির জন্যে দায়ী। মজার ব্যাপার হলো, ডায়েট কোলা নামে লোভনীয় বিজ্ঞাপন দিয়ে যে সফ্ট ড্রিংকস বিক্রি হয় তাতে চিনির পরিবর্তে এসপার্টেম নামে একটি কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়। দেহের উপর এ উপাদানটির রয়েছে ৯২ ধরনের ক্ষতিকর প্রভাব। তন্মধ্যে অন্যতম ব্রেন টিউমার, বন্ধ্যাত্ব, ডায়াবেটিস, মৃগী এবং মানসিক ভারসাম্যহীনতা।
কিডনি সমস্যাঃ সফ্ট ড্রিংকস যাতে বরফের মতো জমে না য়ায় সে জন্যে এতে ইথিলিন গ্লাইকল নামে একটি উপাদান ব্যবহার করা হয়। এটি প্রায় আর্সেনিকের মতোই একটি বিষ। কিডনির ওপর এর প্রভাব খুবই ক্ষতিকর। ১ ঘন্টায় আপনি যদি ৪ লিটার কোক খান তাহলে কিডনি ফেইলিওর হয়ে আপনার মৃত্যু নিশ্চিত। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন যারা সফ্ট ড্রিংকস খান না বা পরিমিত খান, তাদের তুলনায় যারা প্রচুর পরিমাণে খান তাদের কিডনিতে পাথর জমার হার প্রায় তিনগুণ। সফ্ট ড্রিংকসে যে স্যাকারিন ব্যবহার করা হয়, তাতে ইউরিনারি ব্লাডার ক্যান্সার অর্থাৎ মূত্রাশয়ের ক্যান্সার সৃষ্টি করে।
শ্বাসকষ্টঃ সফ্ট ড্রিংকসের তাৎক্ষণিক বিপদ হচ্ছে গলা বা শ্বাসতন্ত্রের ক্ষতি। আমাদের নাক, গলায় তথা শ্বাসতন্ত্রের শুরুর দিকের অংশে থাকে অসংখ্য সিলিয়া। শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে আমরা প্রতিনিয়ত যে ধূলিকণা, ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস গ্রহণ করি এই সিলিয়াগুলো সেগুলোকে শরীরের ভেতরে ঢুকতে বাধা দেয়। সফ্ট ড্রিংকস খেলে এসব সিলিয়াগুলো নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। শুরু হয় টনসিলাইটিস, ফেরিংজাইটিস, ল্যারিংজাইটিস, ব্রঙ্কাইটিস বা নিউমোনিয়ার মতো শ্বাসজনিত রোগ।
কীটনাশকঃ ২০০৪ সালে ভারতের অন্ধ্র প্রদেশ ও ছত্তিশগড় রাজ্যে কৃষকরা কোকাকোলাকে কীটনাশক হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। এ প্রসঙ্গে অন্ধ্র প্রদেশের রামকৃষ্ণপুরের চাষী গটু লখমাইয়া বলেন, “আমার তুলা চাষের কয়েক হেক্টর জমি জুড়ে আমি সফ্ট ড্রিংকস ব্যবহার করেছি। এটি প্রচলিত কীটনাশকের তুলনায় দামে যেমন সস্তা, তেমনি ব্যবহারকারীর ত্বকের জন্যেও নিরাপদ”।
অকাল বার্ধক্যঃ ম্যাসাচুয়েটসের ৫০ বছর বয়ষ্ক একদল নারী-পুরুষ যারা প্রতিদিন ১ ক্যান বা এর বেশি করে সফ্ট ড্রিংকস পান করেছেন, তাদের ওপর ৪ বছর ধরে চালানো এক গবেষণায় দেখা গেছে, তাদের মেটাবলিক সিনড্রোম বেড়ে গেছে ৪৪%।
বস্ত্রঃ আমরা অধিকাংশ কাপড় বা বস্ত্র ব্যবহারকারী এমনকি পায়ের জুতার ব্যবহারেও সচেতন নই। অথচ যে জিনিসগুলো আমাদের শরীরের সর্ববৃহৎ অংশ বা থার্ড ফিউনী বলে খ্যাত মূল্যবান ত্বকের সংস্পর্শে থাকে। প্রাকৃতির সাথে প্রাকৃতির মিলন বা ছোয়ায় জীবন প্রফুল্ল হয়। প্রাকৃতিক জিনিস হোক তা জীবিত বা মৃত তা কোন অবস্থায়ই ক্ষতিকর নয় এমনকি পুড়া কয়লাও। প্রাকৃতিক জিনিস প্রাণ বা জীবন হারালেও তা প্রাকৃতির কল্যাণেই নিবেদিত বা উৎস্বর্গীত হয়।
আমরা অতি আধুনিকতার নামে প্রাকৃতিক উৎস থেকে আহরিত ও প্রাকৃতিকভাবে প্রক্রিয়াজাতকৃত বস্ত্রাদি পরিধানের অভ্যাস ত্যাগ করে কৃত্রিম তন্তুর বস্ত্রাদি ব্যবহারে অভ্যস্থ হয়ে যাচ্ছি হোক তা যেকোন ব্যবহারের এমনকি পায়ের জুতা পর্যন্ত ব্যবহার করছি কৃত্রিম বস্তু দিয়ে তৈরী। ফলে শরীরের ত্বকের লোমকূপ দিয়ে শরীরের জলীয় অংশ বাহিরে যেতে পারছেনা।
এসব কৃত্রিম বস্তু পরিধানের ফলে শরীরের ত্বকের সাথে সূর্যের আলো সহ সকল প্রকার আদান প্রদান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এতে করে নানাবিধ চর্মরোগ দেখা দেওয়া ছাড়াও ত্বকের স্বাভাবিক রংও পরিবর্তন হচ্ছে। অনেক সময় তা মারাত্বক অসুস্থির কারন হয়েও দেখা দিচ্ছে। এসব কৃত্রিম বস্ত্রাদি বা পরিধানের উপকরণ শিশুদের জন্য ভয়াবহ ক্ষতির কারন হয়ে দেখা দিচ্ছে কারন তাদের ত্বক অতি স্পর্শকাতর।
কীটনাশকঃ প্রাচীন আমলে বনে জঙ্গলে আর মাঠ ও পাথরের গুহা থেকে আমরা আজ বাস করছি ইট-বালুর সুরম্য অট্টালিকায় কত উন্নতিই না হয়েছে আমাদের বাসস্থানের। আমরা ভেবে নিচ্ছি আমাদের নিরাপদ ও সুরক্ষিত বাসস্থান ঝড়-ঝঞ্চাসহ অনেক প্রাকৃতিক দূর্যোগমুক্ত। আধুনিকতাও নিরাপত্তার নামে আমরা নিজেদের বন্দি করে ফেলেছি বিষাক্ত বলয়ে তা ভেবে দেখছি না একবারও। যেখানে বাস করি আমরা তা হয় টিন বা সিআই সিট দিয়ে তৈরী অথবা পুড়া ইট, বালু আর সিমেন্টে তৈরী। যে টিনের ঘরে বাস করি সেই টিন বিষাক্ত কেমিক্যাল দিয়ে গ্যালভানাইজড করা বা প্রলেপ দেয়া, যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এছাড়াও অক্সিডেশন হয়ে মরিচা পড়ে। রোদে প্রচন্ড গরম হয় এবং শীতের দিনে ঘেমে পানি পড়ে অগ্নিকান্ডে সহজে পুড়ে যায়। ঝড় ও সাইক্লোনে দুমড়ে মুচড়ে যায়। কখনও প্রচন্ড বাতাসে তা উড়ে গিয়ে ভয়ানক অস্ত্রের মত মানুষ, পশু-প্রানী ও গাছপালাকে আঘাত করে।
প্রাকৃতিক মাটি পুড়িয়ে গাছপালা কেটে ইট তৈরীতে পরিবেশের ক্ষতি হয়। ফসিল ফুয়েল বা কয়লা পুড়িয়ে কয়লার মধ্যে মারাত্বক ক্ষতিকর ধুয়ায় ও অন্যান্য বিষাক্ত গ্যাসে মানুষ, পশু-পাখী, জীব-জন্তু বা গাছপালা বা সমগ্র পরিবেশের ক্ষতি অথবা প্রাকৃতিক খনিজ সম্পদ গ্যাস পুড়িয়ে প্রকৃতি ধ্বংস করে সেই ইট দিয়ে তার সাথে রাসায়নিকযুক্ত সিমেন্ট মিশিয়ে তৈরী বাসস্থানকেই আমরা উত্তম ও নিরাপদ বলে মনে করি। সিমেন্ট তৈরিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক পদার্থের নাম হলো- হেক্সাভ্যালেন্ট ক্রোমিয়াম যা স্বাস্থ্যের পক্ষে মারাত্বক ক্ষতিকর।
শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুসে মারাত্বক ক্ষতিকর এই সিমিন্টের দেয়াল রং করতে বিষাক্ত রাসায়নিক যুক্ত নানা প্রকার সিনথেটিক রং ব্যবহার করা হয় যা থেকে নিঃসারিত বায়বীয় পদার্থ নিঃশ্বাসের সাথে দেহে প্রবেশ করে ক্যানসার সহ নানা প্রকার প্রাণঘাতী রোগ সৃষ্টি করতে পারে। আমরা আজকাল প্রাকৃতিক চুনের প্রলেপ দিয়ে সিমেন্টে ব্যবহৃত রাসায়নিক ক্ষতি কমানোর পরিবর্তে ক্ষতিকর রাসায়নিক দিয়ে তৈরী সিনথেটিক রং ব্যবহার করে বাসস্থানের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে অভ্যস্থ কিন্তু নিজের জীবনে তার ক্ষতিকর প্রভাব একবারও কি ভেবে দেখেছি?
শিক্ষাঃ মানুষের প্রয়োজন জীবন ও কর্মমূখী শিক্ষা যার সাথে সম্পৃক্ত থাকবে সৃজনশীলতা। জীবন ও কর্মমূখী শিক্ষায় সৃজনশীলতা মানুষের মানুষ্যত্বের বিকাশ ঘটায়। মানুষ এ শিক্ষা ব্যবস্থায় যা শিখে তা কর্মজীবনে ব্যবহার করে ফলে শিক্ষা ও কর্ম মানুষের জীবনের অঙ্গ হয়ে যায়।
আজকাল দেখা যাচ্ছে ডাক্তারী পাশ করে ব্যাংকার, ইঞ্জিয়ারিং পাশ করে প্রশাসন ক্যাডারে, উদ্ভিদ-প্রানী বিজ্ঞানে পাশ করে আমদানী-রপ্তানী বিভাগ বা অন্য পেশায়। অর্থাৎ যে সব বিষয়ে তার অর্জিত জ্ঞান সে পেশায় নাই তার কোন অবদান!
তাছাড়া শিক্ষা শুরু লগ্নে শিক্ষার্থীরা যে বিষয় নিয়ে পড়ে সে বিষয়ে ভবিষ্যৎ রচনা না করে স্বপ্ন দেখে বেশী আয় রোজগারের চাকুরীর আর তার পিছনেই ছুটে।
জীবনমুখী শিক্ষার মাধ্যমে নিজেকে বিকশিত না করে বিলাসী জীবন যাপন, ধন সম্পদ অর্জন, কর্মজীবনে ক্ষমতা ও পদ-পদবি অর্জন এসব নিয়েই তারা ব্যস্ত থাকে সারাক্ষণ।
নৈতিক শিক্ষার বিষয়গুলো পাঠ্যপুস্তক থেকে উঠে গিয়ে সেখানে ব্যক্তি কেন্দ্রিকতা, ব্যক্তি স্বার্থ ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু হচ্ছে দিন দিন। এভাবে মানুষ শিক্ষা গ্রহণের ফলে মানুষের ভিতরকার মানবতাবোধ ও মনুষ্যত্ববোধ সুপ্তই রয়ে যায়। এভাবে জীবন যাপনের ফলে একসময় মানুষের মধ্যে হতাশা বোধ আর নিজেকে অপরাধী বলে মনে হয় তখন সে অসহায় বোধ করে এবং এর থেকে তার শরীরবৃত্তে একধরনের প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়ে নানা রকম শারীরিক সমস্যা বা রোগ ব্যাধির সৃষ্টি হয়। মন বা হৃদয় বলে আমরা যা বুঝি আসলে তা মস্তিষ্কের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া মন বা হৃদয় বলে কিছু নেই। হতাশার কারনে যখন মস্তিষ্কে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয় তখন শরীরে তার প্রভাব পড়ে তাই দেহ বা শরীর যন্ত্র তখন তার স্বাভাবিকভাবে কাজ করে না আমরা একেই বলি অসুস্থতা। আমরা বলে থাকি A sound body is in a sound mind! – এটাই হলো মস্তিষ্কের সাথে শরীরের আন্তঃসম্পর্কীয় বিষয়।
চিকিৎসাঃ মানুষ যখন পৃথিবীতে আগমন করেছে তখন থেকেই কোন না কোন কারনে নানাবিধ মানসিক ও শারীরিক সমস্যার সম্মুখীন হতে শুরু করেছে। মানুষের বুদ্ধিমত্তার যেভাবে বিকাশ হয়েছে শারীরিক ও মানুষিক সমস্যার ধরনও পরিবর্ন হয়েছে। মানুষ যখন কোন শারীরিক সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে যখন তারা মুক্তাঙ্গনে বা বনে-জঙ্গলে বিচরণ করেছে তখন নিজের সমস্যা নিজেই প্রাকৃতিক কোন না কোন অবলম্বন নিয়ে তা থেকে পরিত্রানের পথ খুঁজেছে। নিজে নিজের সমস্যার সমাধানের উপায় না পেলে অন্যের দ্বারস্থ হয়েছে।
শুধু মানুষ কেন পশু-পাখী ও জীব-জন্তুও নিজেদের সমস্যা নিজেরাই সমাধান করে যদি তারা থাকে মুক্ত অবস্থায়। যেমন আমরা দেখি, কুকুর-বাঘসহ এমন অনেক প্রাণী আছে তাদের বদ হজম বা কোন অযাচিত খাদ্য গ্রহণের ফলে পেটে সমস্যার সৃষ্টি হলে পেট থেকে তা বের করে ফেলা বা বমি করার জন্য ঘাস খায়। ঘাস খেয়ে বমি করতে হবে কে শিখিয়েছে তাকে?
মূল কথা হলোঃ- প্রতিটা জীবের মধ্যে তার রোগ প্রতিরোধ ও প্রতিকারের কলাকৌশলও জ্ঞান রয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টি হলে তার সমাধানের উপায় নিজের মধ্যেই প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্টি হয় অর্থাৎ যার জীবন ও প্রান আছে তা রক্ষা করার কৌশলও তার জানা আছে। কালের বিবর্তনে মানুষের মস্তিষ্কের বিকাশ ঘটায় সমাজবদ্ধ মানুষ আলাদা আলাদা পেশা বা কর্মক্ষেত্র বেছে নিয়েছে ফলে আলাদা আলাদা বিজ্ঞানের বা বিষয়বস্তুর সৃষ্টি হয়েছে আর তারই একটির নাম হলো চিকিৎসা বিজ্ঞান।
অতীতে অনেক বিষয় বিজ্ঞান নামীয় শাস্ত্র পরীক্ষা নিরীক্ষা করে সত্য বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছে আর তা বর্তমান গবেষণায় মিথ্যে বলে পরিণত হয়েছে এবং বর্তমানে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় যা সত্য বলে মনে হচ্ছে তার অনেক কিছুই ভবিষ্যতে মিথ্যে বলে প্রমাণিত হবে তাতে কোন সন্দেহ নাই।
নানা ধরনের চিকিৎসা বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। প্রাচীন চিকিৎসা বিজ্ঞানে মানুষের বর্তমানে যেসব আধুনিক রোগব্যাধি বা শারীরিক ও মানুষিক সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে তার অনেক কিছুরই সমাধান নাই। বর্তমানে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানেও অনেক রোগের চিকিৎসা বা সমাধান নেই বরং আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান রোগীর চিকিৎসা না করে রোগের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবর্তীণ হয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজিত সৈনিকদের যেভাবে আটকিয়ে রাখে সেভাবে রোগ শরীরের মধ্যে আটকিয়ে রাখে কারন রোগ হত্যা বা ধ্বংসের কোন মারণাস্ত্র তাদের হাতে নেই।
কাহিনী হলো এরকম যে, আমরা যুদ্ধ করছি শত্রুর বিরুদ্ধে কিন্তু শত্রুকে পরাজিত করতে পারছিনা তখন অন্যকোন মিত্র বাহিনীকে আমন্ত্রণ জানালাম সাহায্যের জন্য। তারা এসে আমাদের শত্রুদের পরাজিত করে বন্দি করে দিল আমরা আশ্বস্থ হলাম, যে কোন আধুনিক ঔষধ হলো ঐ মিত্রবাহিনীর মতোই।
মানুষসহ সকল জীবের মধ্যেই তার শরীর বা জৈব অবকাঠামাকে রক্ষার ক্ষমতা বা শক্তি সংরক্ষিত আছে এবং তা প্রয়োগের কলাকৌশলও জানা আছে। কিন্তু সভ্যতার বিকাশে মানুষের সেই সুপ্ত শক্তি ঢাকা পরে গেছে যা এখনও পূনর্জীবিত করা সম্ভব। সুখের বিষয় হলো মুক্ত পশু-পাখীর মধ্যে এখনও তা বিদ্যামান আছে। নেই শুধু যেসব পশু-পাখী ও উদ্ভিদকুল আটকা পড়েছে মানুষ নামক প্রানীর জালে।
দেখুন না পাখী বা মুরগীর গায়ে উকুন হলে পাখনা দিয়ে বালি কিভাবে মেখে রোদে শুয়ে থাকে! প্রতিটি জীবের মধ্যেই নিজেকে সকল প্রতিকুলতার বিরুদ্ধে টিকে থাকার জ্ঞান রক্ষিত আছে।
এ বিষয়গুলো চিকিৎসা বিজ্ঞানের কথা বলতে গিয়ে উল্লেখ করা হলো এ কারনে যে, রোগব্যাধি প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য চিকিৎসকের প্রয়োজন তখনই পড়ে যখন নিজের বুদ্ধিমত্তার প্রতি নিজের বিশ্বাস না থাকে। এমন কোনও রোগব্যাধি বা শারীরিক ও মানুষিক সমস্যা মানুষের সৃষ্টি হবে না যার সমাধান মানুষের জানা নেই পারমাথেরাপির মূলমন্ত্রও হলো সেটাই।
বিনোদনঃ বিনোদনের সংজ্ঞা নানাজন নানাভাবে দিয়ে থাকে। সাধারণত বাহিরের কোন জিনিস যেমন সিনেমা, গান, ভ্রমন, খেলাধুলা ইত্যাদি যা আমাদের আনন্দ দেয়, সাময়িকভাবে আমরা উৎফুল্ল হই, যাতে আমাদের মানসিক অবসন্যতা অনেকটা লাঘব হয় তাকেই আমরা বিনোদন বলে থাকি। অনেক সময় মানুষ, জীব-জন্তু বা পশু-পাখীর উপর নিষ্ঠুর আচরনও আমরা বিনোদন হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকি। যেমন সার্কাস খেলায় মানুষের শারীরিক কসরত এবং জীব-জন্তু বা পশু-পাখীকেও কসরত এবং জীব-জন্তু বা পশু-পাখীকেও কোন কাজে বাধ্য করা। হাটে ঘাটে সাপ আর বানরের খেলা দেখানোও আমরা বিনোদন মনে করি এবং তা উপভোগ করি। অর্থাৎ কারও জীবনের ঝুঁকি, শারীরিক ও মানুষিক কষ্টও আমাদের কাছে বিনোদনের উপকরণ বলে আমরা মনে করি!
কেউ কেউ যৌন উপভোগকেও বিনোদন বলে মনে করে অথচ যৌন উপভোগ হলো যৌনদনা যা মানুষ, জীব-জন্তু বা পশু-পাখীর ভিতর থেকে একটি নিদির্ষ্ট বয়ো সন্ধিক্ষণে আসে অথচ বিনোদনের কোন নিদির্ষ্ট বয়ো সন্ধিক্ষণ নাই। যেমন একজন ছোট শিশুও বিনোদন করতে পারে।
বিনোদন ও যৌনদনের সাথে মানুষের রোগব্যাধি এবং শারীরিক ও মানুষিক সমস্যার ওতপ্রোত সম্পর্ক আছে। পরিচ্ছন্ন বিনোদন ও নৈতিক যৌনদন মানুষের শারীরিক শক্তি, মানসিক শক্তি, স্মৃতি শক্তি, যৌবন শক্তি ও যৌন শক্তি বৃদ্ধি করে।
অন্যদিকে অপরিচ্ছন্ন বা অমানবিক বিনোদন, অনৈতিক বা অযৌক্তিক যৌনদন মানুষের বিবেক বুদ্ধি লোপ করে হিংস্রতার জন্ম দেয়। মানুষের মস্তিস্ক তা সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেনা ফলে নানাবিধ রোগ-ব্যধি এবং শারীরিক ও মানুষিক সমস্যা সৃষ্টি হয়। অনেক ক্ষেত্রে মানুষকে অপরাধ প্রবণ করে তোলে। এসব বিষয়গুলো আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান বিবেচনায় নেয়নি কারন তারা রোগের চিকিৎসা করে রোগীর নয়।